আজ মাকালকান্দি গণহত্যা দিবস

maklkandi-sm20120818005816

স্টাফ রিপোর্টার ॥ হবিগঞ্জের মাকালকান্দি। একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। ১৮ আগস্ট, ১৯৭১। সকাল বেলা গ্রামের চণ্ডি মন্দিরে মনসা ও চণ্ডি পূজার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামের বাসিন্দারা। এ সময় ৪০/৫০টি নৌকাযোগে পাকবাহিনী এসে গ্রামে হামলা চালায়। তারা পূজারত নারী-পুরুষদের চণ্ডি মন্দিরের সামনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। এতে একই পরিবারের ১১ জনসহ ৮৫ গ্রামাবাসী প্রাণ হারান। গ্রামবাসীর রক্তে লাল হয় পূজার ফুল। হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাক বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় ভাটি বাংলার শিা-দীা, খাদ্য ভাণ্ডারে সমৃদ্ধশালী গ্রাম মাকালকান্দি থেকে কোটি টাকার সম্পদ লুটে নেয়। নারীদের ওপর চালায় পাশবিক অত্যাচার। যাবার সময় পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বাড়ি ঘর। বানিয়াচং উপজেলা সদর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ভাটি অঞ্চলে দ্বীপের মতো অবস্থান কাগাপাশা ইউনিয়নের মাকালকান্দি গ্রামটির। সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত, শিা-দীা ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধশালী গ্রামটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী হানা দেবে তা গ্রামের লোকজনের ছিলো ভাবনার অতীত। তারা নিশ্চিন্তে অতিবাহিত করছিলেন অস্থিতিশীল সময়। স্থানীয় শান্তিকমিটির নেতা সৈয়দ ফয়জুল হক তাদেরকে অভয় দিয়েছিল রার। সেই ফয়জুল হকই পাকবাহিনীকে পথ দেখিয়ে মাকালকান্দি গ্রামে নিয়ে আসে। নিরস্ত্র গ্রামবাসীর ওপর চলে নারকীয়তা।
এমনকি চারদিনের শিশু পর্যন্ত রেহাই পায়নি তাদের হাত থেকে। মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে বেওনেট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। শিশুটির মা হৃদয় বিদারক সেই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন আজও। সেদিনের কথা বলতে গিয়ে মিনতি রানী চৌধুরী (৭৬) কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বিলাপ করে বলেন, আমার করার কিছুই ছিল না। চোখের সামনে আমার চারদিনের ছেলেকে হত্যা করে পশুরা। তাদের পায়ে পড়েছিলাম কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সেদিন আকস্মিকভাবে বেঁচে গেছি। গুলিবিদ্ধ হয়েও সেদিন প্রাণে রা পান কংশ মোহন দাশ (৮৫)। তিনি জানান, সারিবদ্ধ অবস্থায় আমাদের গুলি করে পাঞ্জাবীরা। গুলিবিদ্ধ হয়ে আমিও পরে যাই। যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন নিজেকে লাশের স্তুপে আবিস্কার করি। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হলেও পঙ্গুত্ব গুচেনি। নারকীয় এ হত্যাযজ্ঞের কথা মনে হলে এখনও শিহরিত হয়ে ওঠে মাকালকান্দির জনগণ। স্বাধীনতার পর মাকালকান্দি বধ্যভূমি ৩৬ বছর অযতেœ অবহেলায় পড়ে ছিল। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট গণহত্যা দিবসে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। সেই থেকে দিবসটি পালন করছে স্থানীয় লোকজন।
পাকিস্তানীদের হাতে সেদিন যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন তাদের মধ্যে যাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে তারা হলেন, কর্ণমোহন চৌধুরী, কৃপেন্দ্র চৌধুরী, কানু চৌধুরী, গিরিন্দ্র চৌধুরী, ধীরেন্দ্র চৌধুরী, নকুল দাশ, প্রমোদ চৌধুরী, অন্নদা চৌধুরী, মীরালাল চৌধুরী, জহরলাল দাশ, গুনেন্দ্র দাশ, হরেন্দ্র চৌধুরী, ীরেন্দ্র চৌধুরী, গুরুচরণ চৌধুরী, রবীন্দ্র চৌধুরী, ফণিলাল দাশ, ইন্দ্রলাল দাশ, সরীন্দ্র দাশ, সূর্যমণি দাশ, অভিনয় চৌধুরী, গিরিষ চৌধুরী, জ্যোতিষ চৌধুরী, খোকা চৌধুরী, কুমেদ চৌধুরী, নৃপেন্দ্র দাশ, লবুরাম দাস, তরণী দাশ, দীনেশ দাশ, ঠাকুরচান দাশ, মনোরঞ্জন দাশ, খতন দাশ, সদয়চান দাশ, কুমোদিনী চৌধুরী, সরলাবালা চৌধুরী, ছানুবালা চৌধুরী, মিনুবালা চৌধুরী, তমালরাণী চৌধুরী, সুশীলাসুন্দরী চৌধুরী, নিত্যময়ী চৌধুরী, মুক্তলতা চৌধুরী, স্বপ্নারাণী চৌধুরী, ললিতারাণী চৌধুরী, মিলুরাণী চৌধুরী, পিলুরাণী চৌধুরী, উজ্জ্বলারাণী দাশ, সত্যময়ী দাশ, উন্মাদিনী দাশ, হেমলতা দাশ, সুচিত্রাবালা দাশ, ব্রহ্মময়ী দাশ, শুসীলাবালা দাশ, চিত্রাঙ্গ দাশ, বিপদনাসিনী চৌধুরী, সোহাগীবালা দাশ, শৈলজবালা দাশ, শোভারাণীবালা দাশ, অঞ্জুরাণী দাশ, মরীরাণী দাশ, লীরাণী দাশ, সোমেশ্বরী দাশ, চিত্রময়ী চৌধুরী, শ্যামলা চৌধুরী, তরঙ্গময়ী চৌধুরী, সরস্বতা চৌধুরী ও সরুজনী চৌধুরী।

Share on Facebook

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>