আইনজীবীদেরকে কেন সম্মানের চোখে দেখবেন

আইনজীবীদেরকে কেন সম্মানের চোখে দেখবেন

এম এ মজিদঃ প্রথমেই বলে নেই আমি পৃথিবীর সকল পেশা, ধর্ম, জাতী, বর্ণ, নৃগোষ্টি সবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কাউকে আমি ছোট করে দেখি না, কোন পেশাকেই আমি অসম্মানের মনে করিনা। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার পেশাকে সবার উপরে রাখি এ জন্য যে, যদি আমি আমার পেশাকে ভালই না বাসি তাহলে এ পেশায় আসলাম কেন? আমার মনে হয় সবারই সব পেশাকে সম্মানের সাথে দেখে নিজের পেশাকে সবার উপরে রাখা দোষের কিছু নয়।

দেশের ৫১ হাজার আইনজীবী নিয়ে এক শ্রেণীর মানুষের মাথা ব্যথা চোখে পড়ার মতো। অথচ ১৬ কোটি মানুষের দেশে ৪০ লাখ মামলা পরিচালনার জন্য ৫১ হাজার এডভোকেট খুব যথেষ্ট বলে মনেই হয় না। আমার কিছু বন্ধু আছে যারা কলেজের শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিক, পুলিশ কিংবা অন্য পেশার সাথে সম্পৃক্ত। তাদের বেশির ভাগ আইন পেশাকে খারাপ চোখে দেখেন।

আমি তাদের খারাপ চোখে দেখাকে সম্মান করি। আসলে তাদেরকে বিষয়টা ঠিকভাবে কেউ বুঝায়নি, তারাও বুঝেনি। জেলা সদরে এতো আইনজীবী দেখে তারা মনে করে পুরো জেলা আইনজীবীরাই দখল করে আছেন। বিষয়টি ঠিক এমন না। আমি শুধু তিনটি পেশার মানুষের তুলনা করতে চাই। কলেজ শিক্ষক, রেজিষ্ট্রার্ড ডাক্তার ও আইনজীবী।

হবিগঞ্জে ৯টি থানায় অন্তত ২৫টি কলেজ রয়েছে। রয়েছে একাধিক ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসা। ওইসব কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকের সংখ্যা কত হবে? সরকারী বেসরকারী মিলিয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ৩ হাজারের নিচে হবে না। সকল শিক্ষককে যদি বলা হতো আপনারা জেলা সদরে অবস্থান করে শিক্ষাদান করবেন, প্রাইভেট পড়াবেন, ইচ্ছা মতো ছাত্রদের কাছ থেকে টাকা নিবেন, নিজেদের সাইনবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন, তাহলে বিষয়টা কেমন হতো।

একবার চিন্তা করে দেখুন, শিক্ষকদের সাইন বোর্ডে শহরে তলিয়ে যেত, রাস্তাঘাটে হাটা যেত না, একেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি ১৫ জন শিক্ষক থাকেন, তাহলে গ্র“প থাকে ৯টা। আমি অন্তত ১ ডজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দলাদলি কোন্দল রেষারেষি গ্র“পিং অর্থ আত্বসাত ইত্যাদি বিষয়ে সংবাদ লিখেছি। সংবাদ লেখার জন্য শিক্ষকদের একটি অংশ প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করেন। সংবাদ লিখলে এসব নিয়ে প্রতিদিনই সংবাদ লেখা যাবে। বাস্তব আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না।

হবিগঞ্জে ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৭৮টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১টি জেলা সদর হাসপাতাল, ১টি মাতৃ মঙ্গল, ১টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। রয়েছে জেলা সদরসহ উপজেলা সদর গুলোতে প্রতি পাড়ায় পাড়ায় ক্লিনিক। ২০ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার জন্য প্রতিদিন কতজন শুধু রেজিষ্ট্রার্ড ডাক্তার চিকিৎসা প্রদান করেন। প্রতিদিন অন্তত দেড় হাজার রেজিষ্ট্রার্ড ডাক্তার ২০ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত। এর বাহিরে রয়েছেন হোমিও প্যাথিক ডাক্তার, হাতুড়ে ডাক্তার, ফার্মেসী ডাক্তার ইত্যাদি।

তারপরও আমরা মনে করি ডাক্তারের সংখ্যা কম, আরও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার প্রয়োজন। শুধু দেড় হাজার রেজিষ্ট্রার্ড ডাক্তারকে যদি বলা হতো আপনারা শুধু জেলা সদরে চিকিৎসা সেবা প্রদান করবেন, নিজেদের সাইন বোর্ড ব্যবহার করবেন, ইচ্ছা মতো রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেবেন। তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাড়াতো। ডাক্তার ও রোগীর ভিড়ে এমনিতেই শুক্রবারে শহরে চলাচল করা যায় না।

যদিও নির্লজ্জভাবে কোনো কোনো চিকিৎসক শহরে বা গ্রামে গঞ্জে নিজের সাফাই গেয়ে মাইকিং করান। খুব ভাল ছাত্র হিসাবে একটি মেডিকেল কলেজে পড়ে, ডাক্তার হয়ে, সেবা দিতে গিয়ে, টাকা রুজি করতে গিয়ে, মাইকিং করা লাগবে, এতো নিচু একটা মানুষ হয় কিভাবে। তারা নিজেরা যখন নিজেদের মাইকিং শুনেন, কেমন লাগে আমার জানতে বড় ইচ্ছা হয়। আমি মনে করি না কোনো ইজ্জত সম্পন্ন ডাক্তার মাইকিং করে, গাড়িতে, বাড়িতে, দেয়ালে, পোষ্টারিং করে রোগী সংগ্রহ করতে পারেন।

যদি কোনো ক্লিনিক এমন করেও তাদেরকে তাৎক্ষনিক বন্ধের নির্দেশ দেয়া ডাক্তারের নৈতিক দায়িত্ব। ডাক্তার সাহেব কোথায় রোগী দেখবেন তা পরের বিষয়, কিন্তু ডাক্তার সাহেবের সাইন বোর্ড পাওয়া যায় হাটে, বাজারে, রাস্তায়, মহাসড়কের পাশের গাছে ঝুলানো, বিদ্যুতের খুটিতে ঝুলানো। একইভাবে আপনি অন্য যে কোনো পেশাকে কনসাইস করে যদি এক জায়গায় জড়ো করেন, তাহলে বিষয়টি কেমন হবে। উদাহরণ হয়তো আরও অনেক দেয়া যেত।

এবার আসা যাক, আইন পেশার দিকে। হবিগঞ্জের ২০ লাখ মানুষের আইনী সেবা দিতে সনদপ্রাপ্ত আইনজীবীর সংখ্যা ৬শ। (যেখানে কলেজ ও সমমানের শিক্ষার্থীর জন্য ৩ হাজারের বেশি শিক্ষক, ২০ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার জন্য দেড় হাজারের বেশি ডাক্তার)।

এরশাদ সরকারের পতনের পর উপজেলা কোর্ট গুলোকে বাতিল করে জেলা সদরে নিয়ে আসা হয়। আইনজীবীরা জেলা সদরে বসবাস শুরু করেন। ৬শ আইনজীবীর মধ্যে ৩শ আইনজীবীর মতো শহরে থাকেন, বাকীরা কিন্তু নিজ নিজ বাড়িতেই থাকেন। শহরে বসবাসকারী ৩শ আইনজীবীর মধ্যে অন্তত ২০০ আইনজীবীর সাইন বোর্ড রয়েছে।

আইনজীবীদের সাইন বোর্ড টাঙ্গানোর বিষয়েও কিন্তু আইন আছে। একজন আইনজীবী তার বাসাকে চিহ্নিত করতে ৫০ গজের বেশি দুরুত্বে সাইন বোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না, সাইন বোর্ডটি হতে হবে সাদা কালো। নিজের সাফাই গেয়ে পত্রিকায় কিংবা ডিশ লাইনে বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন না, বিজ্ঞাপনের অর্থ বহন করে এমন কোনো ক্যালেন্ডার কোনো আইনজীবী ছাপাতে পারবেন না।

কোনো দিন দেখেছেন কোনো আইনজীবী তার নিজের সাফাই গেয়ে কোথাও কোনো বিজ্ঞাপন দিতে? এই জিনিসটা তো খেয়ালই করেন নাই। এটা যে একটা আইন, তাও হয়তো জানেন না। গর্ভজাত সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত থেকে শুরু করে জন্মের পর মৃত্যু পর্যন্ত এবং মৃত্যুর পর তার লাশের নিরাপত্তা নিশ্চিতেও আইন রয়েছে। ফৌজদারী বিষয় ছাড়াও সহায় সম্পদের সাথে, ব্যক্তির, ধর্মের, পেশার ইজ্জতের সাথে আইন জড়িত। জীবনের প্রত্যেকটি পর্যায়ে আপনার সাথে আইন জড়িত।

ডাক্তাররা শুধু একটি মানুষের দেহের চিকিৎসা করেন, শিক্ষকরা একটি শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ব্রেইনের চিকিৎসা করেন বিপরীতে একজন আইনজীবী কিন্তু একটি মানুষের জন্মের পূর্বের ব্র“ণ থেকে জন্ম নেয়ার পর, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এমনকি মৃত্যুর পর লাশ দাফন পর্যন্ত তাকে সুরক্ষার যাবতীয় আইনী চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

আমাদের একটি বদ্ধমূল ধারণা হল- যারা আইনের আশ্রয়ে আসেন তারা সমাজের খারাপ, আমাদের চোখে পড়ে শুধু মার দাঙ্গা, মাদক, নির্যাতন, আগুন, এসিড, ইত্যাদি। কেউ কেউ যে শুধু তার ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য আইনের আশ্রয়ে আসেন তার খবর আমরা রাখি না।

এই যে, ৬শ আইনজীবী একসাথে এক ছাদের নিচে একই বই পড়ে ২০ লাখ মানুষকে নিয়ে, তাদের সহায় সম্পদকে নিয়ে আইন ব্যবসা করছেন, আইনজীবীদের নিজেদের মধ্যকার কয়টা খারাপ উদাহরণ আপনি দিতে পারবেন? যদি দেড় হাজার ডাক্তার একই শহরে একই ছাদের নিচে বসে মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যবসা করতেন কিংবা ৩ হাজার শিক্ষক একই শহরে একই ছাদের নিচে বসে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করতেন, আপনি কি দেখতেন? দুচারটি ছোট খাট ঘটনা বাদ দিলে বিভিন্ন মতের, পথের, ধর্মের, রাজনীতির, সমাজের এতো প্রভাবশালী (মন্ত্রী এমপি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ধর্মীয় গুরুজন) মানুষগুলো একই ছাদের নিচে সুশৃংখলভাবে ব্যবসা করা খুব বিরল হিসাবেই দেখবেন।

আর সব পেশায় তো কিছু ভাইরাস থাকবেই। কিন্তু সেটা শতাংশের বিচারে কত। করোনা মহামারী দিয়ে বিচার করলে আপনি আইনজীবীদেরকে সম্মান করতে বাধ্য হবেন। দেড় হাজার ডাক্তারকে কিংবা ৩ হাজার শিক্ষককে কিংবা অন্য কোনো পেশার মানুষকে যদি বলা হতো আপনাদের অনির্দিষ্টকালের বেতন বন্ধ বা আপনারা অনির্দিষ্টকালের জন্য রোগী দেখতে পারবেন না, প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না, তাহলে দাবী দাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ, সমাবেশ, রাস্তা অবরোধ, অনশনসহ কত ধরনের আন্দোলন হতো, বিপরীতে ৬শ আইনজীবীর জন্য অনির্দিষ্টকালের আয়ের ক্ষেত্র বন্ধ (যদিও ভার্চৃয়াল কোর্ট ওপেন, বিষয়টা শুধু হাজতী আসামীদের জন্য, অন্য কোনো প্রতিকার নেই বললেই চলে), মাসিক কোনো বেতন নেই, কোনো ধরনের প্রনোদনাও নেই, আইনজীবীদের মধ্যে কি কোনো হতাশা, ক্ষোভ, ক্ষিক্ষোভ, প্রতিবাদের ছিটে ফুটা আছে?

অথচ বিশ্বাস করবেন না, কত প্রয়োজনীয় আইনী প্রতিকার পেতে হাজার হাজার মানুষ প্রতিটি সেকেন্ড গণনা করছেন আর আইনজীবীদেরকে চাপ দিচ্ছেন। আমার লেখায় শুধু হবিগঞ্জের বিষয়টি দিলাম, আপনি সারা দেশকে এর সাথে মিলিয়ে নিতে পারেন। চলুন আমরা আইনজীবীকে, আইন পেশাকে সম্মানের চোখে দেখি, সব পেশাকেই মর্যাদা দেই। কাউকে মর্যাদা দিলে, সম্মান দেখালে নিজে ছোট হবেন না।

লেখকঃ আইনজীবী ও সংবাদকর্মী