ইন্দিরা গান্ধীর স্মৃতি ফেরালেন প্রিয়াঙ্কা

পুরোনো কংগ্রেস কর্মীরা তাঁর মধ্যে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে খুঁজে পাচ্ছেন৷ তাঁর আগমনে দল যেন নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ৷ সমাজের উচ্চবর্ণ তাঁকে ভাবছে আপনজন৷তবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পাস-‌ফেল নির্ভর করছে নির্বাচনি ফলাফলে৷

‌বিগত এক দশক ধরে দলের অন্দরে ব্যাপক চাহিদা ছিল প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে সক্রিয় রাজনীতিতে নামানোর৷ কিন্তু পারিবারিক কারণে তা হয়ে ওঠেনি৷ এখন ছেলেমেয়েরা অনেকটা বড় হয়েছে৷ মা সোনিয়া গান্ধী প্রায়শই অসুস্থ থাকছেন৷ দাদা রাহুল গান্ধী দলের সভাপতির গুরু দায়িত্ব বহন করছেন৷ তাই রাজনীতির অমোঘ টান আর উপেক্ষা করতে পারেননি তিনি৷ তাঁর শাড়ি, চওড়া হাসি, কব্জির ঘড়ি, কেশবিন্যাস, মঞ্চে বাচনভঙ্গি, এমনকি করজোড়ের কায়দা অনেককেই অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়৷ মনে করিয়ে দেয় ঠাকুরমা ইন্দিরা গান্ধীর কথা৷

সম্প্রতি লখনউ শহরে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ জুড়ে ‘‌রোড-‌শো’-‌তে কয়েক দশক আগের প্রিয়দর্শিনীকে (‌‌ইন্দিরা গান্ধী)‌ চাক্ষুষ করল আম জনতা৷ জনসমুদ্র আছড়ে পড়েছে লখনউয়ের সড়কে৷ লখনউ বিমানবন্দর থেকে নেহরু ভবন, প্রদেশ কংগ্রেসের কার্যালয়ের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার৷ এই পথ পার হতে বড়জোর মিনিট চল্লিশ সময় লাগে, প্রিয়াঙ্কার র‌্যালি সেই পথ পার হতে সময় নিয়েছে প্রায় ছয়‌ ঘণ্টা৷ পথের দু’ ‌পাশ থেকে স্লোগান ভেসে আসছিল, ‘‌‘‌আ গ্যায়া বদলাওকি আঁধি, রাহুল সঙ্গ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী৷’‌’

‌রাহুল গান্ধী বলেছেন, ‘‌‘‌প্রিয়াঙ্কাকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আনা হয়েছে শুধু লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি’‌কে পরাস্ত করার জন্যই নয়, উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের মতাদর্শের মুখ্যমন্ত্রী চাই৷’‌’‌ স্বভাবতই বাড়তি অক্সিজেন পেয়েছে কংগ্রেস৷ উজ্জীবিত কর্মীরা৷

নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রিয়াঙ্কা কি সত্যিই কংগ্রেসের হারানো জমি ফিরিয়ে দিতে পারবেন? নিখুঁত জবাব মিলবে মাস দেড়-‌দুই পরে, নির্বাচনের ফল ঘোষণা হলে৷ তবে ইন্দিরা-সদৃশ চেহারা অথবা ইন্দিরার নাতনি বলেই রাজনীতিতে ‘মিরাকল’ ঘটিয়ে ফেলবেন তিনি, এমনটা মনে করছেন না অনেকেই৷ অভিনেত্রী, তথা ভারতীয় জনতা পার্টির সাংসদ রূপা গাঙ্গুলী তাঁদের মধ্যে একজন৷

তাঁর মতে, ‘‌‘‌ওঁর স্বামীকেই বেশি মানুষ চেনেন৷ ওঁদের বিরুদ্ধে পারিবারিকভাবে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ আছে, মানুষ সেসব জানেন৷ ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে সবাই সব খবর পায়৷ ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে চেহারার মিল থাকলে রাজনীতির সঙ্গে কী সম্পর্ক৷ আগেকার দিনে অভিনেত্রীরা বিয়ের পর তাঁদের কদর কমে যাওয়ার ব্যাপার ছিল৷ তখন জনপ্রিয়তায় চেহারা গুরুত্ব পেতো৷ এখন শুধুমাত্র কারো মতো দেখতে বলেই রাজনীতিতে বাজিমাত করা যাবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই৷ রাজনীতি এত সহজ নয়৷’‌’‌

ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশে মোট ৮০টি লোকসভা কেন্দ্র৷ পূর্বীয় উত্তরপ্রদেশে ৪০টি, পশ্চিমে ৪০টি৷ এই দুই ভাগের দায়িত্ব পেয়েছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া৷  প্রিয়াঙ্কা যে অংশের দায়িত্ব পেয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনি কেন্দ্র বারাণসি এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের গোরখপুরের মতো কেন্দ্র৷ একদা কংগ্রেসের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত ছিল রাজ্যের পূর্ব ভাগ৷ এখান থেকেই জয়ী হয়েছেন জওহরলাল নেহরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রীরা৷ এ পর্যন্ত দেশের ৭ জন প্রধানমন্ত্রী এসেছেন এই রাজ থেকে৷ কিন্তু গত কয়েক দশকে সেই হিসেব বদলেছে৷ রাজ্যে এখন কংগ্রেসের গড় ভোট ১০ শতাংশে এসে ঠেকেছে৷ এমন একটা পরিস্থিতি থেকে দলকে ঘুরে দাঁড় করাতে শুধুই গ্ল্যামার বা ইন্দিরার স্মৃতি উসকে দেওয়া যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অনেকে৷ প্রয়োজন সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি এবং উপযুক্ত রণকৌশল৷

কংগ্রেস নেতারা সংগঠন এবং উপযুক্ত রণকৌশলের কঠিন, কঠোর পরিধি মাড়াতে চাইছেন না৷ তাঁরা ভরসা রাখছেন ‘‌প্রিয়াঙ্কা ম্যাজিক’‌-‌এর ওপর৷ কেউ বলছেন, প্রিয়াঙ্কা সুনামির মতো জয় নিয়ে আসবেন৷ কেউ বলছেন, প্রিয়াঙ্কা মাঠে নামলে জনপ্লাবনে ভেসে যাবে বিরোধীরা৷ কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ঘনিষ্ঠ বাংলার নেতা শুভঙ্কর সরকারও তাই মনে করেন৷

তাঁর কথায়, ‘‌‘‌‌প্রিয়াঙ্কাকে কেউ আঁধি বলছেন, কেউ তুফান বলছেন৷ রাহুল গান্ধী তাঁকে সামনে এনে আসলে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে তুলতে চাইছেন৷ লক্ষ্য শুধু লোকসভা নির্বাচন নয়৷  আগামী বিধানসভা নির্বাচনে প্রিয়াঙ্কা আশির দশকের সেই ইন্দিরা জমানার উত্তরপ্রদেশ ফিরিয়ে দেবেন৷ সুপ্রিম কোর্ট, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, সিবিআই, ইডি-‌সহ সব সংস্থা ধুলিসাৎ হয়ে গেছে৷ উত্তরপ্রদেশ-‌সহ গোটা ভারত প্রিয়াঙ্কার হাত ধরে আলোর দুনিয়ায় পৌঁছতে চাইছেন৷ বিরোধীরা ভয় পেয়েছে৷ প্রিয়াঙ্কার জনসমর্থন আসবে সুনামির মতো৷ মানুষের আঁধি আসবে৷ তাই সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাহুল৷’‌’