এপ্রিলজুড়েই অব্যাহত থাকবে রুদ্ররোষ ঝড়ঝঞ্ঝা এবং খরতাপ

0

মার্চের শেষদিন সন্ধ্যায় ৭৪ কিমি. বেগে ঝড়ো হাওয়া নিয়ে কালবৈশাখী হানা দেয় রাজধানীসহ দেশের বেশির ভাগ এলাকায়। মৌসুমের প্রথম ঝড় এভাবেই তার রুদ্ররূপ জানিয়ে দেয়। পরে আরও দুই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী আঘাত হানে। কালবৈশাখীর ওপর ভর করে আসা প্রাক-বর্ষার এ রুদ্ররোষ, ঝড়ঝঞ্ঝা এবং খরতাপ এপ্রিলজুড়েই অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে এ মাসে একাধিক তীব্র কালবৈশাখী ছোবল দিতে পারে। অন্তত পাঁচ থেকে ছয়দিন বজ্রঝড় হতে পারে। এছাড়া এক-দুটি নিুচাপ এবং এর থেকে একটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে। কয়েকদফায় তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। আবহাওয়া অধিদফতরের (বিএমডি) দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে এ তথ্যপ্রকাশ করা হয়েছে।

তিন দিনে কালবৈশাখীর ছোবলে ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও গাছচাপা এবং বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছে। সাধারণত এ সময় প্রচুর বজ্রপাত ও বজ্র ঝড়ে নানা দুর্ঘটনা ঘটে। গাছ ভেঙে পড়ে, মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারান কৃষক-জেলে। টইটম্বুর নদীতে নৌদুর্ঘটনায়ও প্রাণহানি হয়। এ মৌসুমের প্রথম কালবৈশাখীর দিন রোববারই এমন ঘটনায় ঢাকায় ৮ জন এবং মৌলভীবাজারে দুই শিশু নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বিএমডি’র আবহাওয়াবিদ মো. আবুল কালাম মল্লিক মঙ্গলবার বিকালে বলেন, ক্ষেত্র বিশেষে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই কালবৈশাখীর আনাগোনা শুরু হয়। তবে আমাদের দেশে মার্চ, এপ্রিল ও মে- এ তিন মাসকে প্রাক-মৌসুম বলা হয়। এ সময়ে যে ঝড়বাদল হয় তাকে বাংলাদেশ ও কলকাতায় স্থানীয়ভাবে ‘কালবৈশাখী’ বলা হয়। আসলে এই ঝড়ের তাত্ত্বিক নাম ‘বজ্রঝড়’। এ সময়ে সারা দেশেই এটি হয়ে থাকে। চলমান এ বৈরী পরিস্থিতি গোটা এপ্রিলেই কমবেশি থাকবে। তবে একটি স্পেল তৈরি হলে সেটি কয়েকদিন চলার পর কিছুদিন বিরতি থাকবে। এরপর ফের শুরু হবে। এ প্রক্রিয়ায়ই এগিয়ে যায় প্রাক-মৌসুম এবং মৌসুম। সেই হিসাবে চলমান বৈরী পরিস্থিতি চলতি সপ্তাহজুড়ে চলার পর কিছুদিন আবহাওয়া ভালো থাকবে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এই সময়ে সূর্য থাকে মাথার ওপর। খাড়াভাবে কিরণ দেয়। ফলে প্রকৃতি খুবই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাশাপাশি বয়ে চলে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শুষ্ক ও গরম বাতাস। সেই সঙ্গে পুবালি বা উত্তর-পশ্চিমের আর্দ্র বাতাসের সংমিশ্রণে তৈরি হয় বজ্রঝড়। ফলে বাংলাদেশে প্রাক-মৌসুমে বা এপ্রিল-মে মাসে ঝড়ঝঞ্ঝা এবং তাপপ্রবাহের উপস্থিতি সাধারণ চিত্র।

৩ মার্চ আবহাওয়া বিভাগ তিন মাসের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাস জারি করে। দু-একদিনের মধ্যে চলতি মাসের পূর্বাভাস জারি করবে। দুই পূর্বাভাস থেকে জানা গেছে, এপ্রিলে বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি নিুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এছাড়া দেশের উত্তর থেকে মধ্যাঞ্চলে দুই থেকে তিনটি মাঝারি বা তীব্র কালবৈশাখী বা বজ্রঝড় হতে পারে। দেশের অন্যত্র ৪-৫ দিন হালকা বা মাঝারি কালবৈশাখী বা বজ্রঝড় হতে পারে।

এপ্রিলের মাঝামাঝি গ্রীষ্মের আগমন ঘটে বাংলার প্রকৃতিতে। এটা আবহমানকাল ধরেই অন্য ঋতু অপেক্ষা উষ্ণতর সময়। ফলে বৈশাখের আগমনের পর ভিন্ন দৃশ্যপটের আগমন ঘটবে। দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বয়ে যেতে পারে একটি তীব্র তাপপ্রবাহ। দেশের অন্যত্রও এ মাসে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাবে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, ব্যারোমিটারের পারদ ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলে। ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তাকে বলা হয় মাঝারি তাপপ্রবাহ। আর তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেলে তা তীব্র তাপপ্রবাহ। সম্প্রতি বিএমডির আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম বাংলাদেশের ঝড়বৃষ্টির ওপর গবেষণা চালান। তাতে তিনি পেয়েছেন, মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যত ঝড়বৃষ্টি হয়, তার মাত্র ৩৮ শতাংশ হয়ে থাকে প্রাক-মৌসুমে। আর ৫১ শতাংশ হয় জুন-সেপ্টেম্বরে, আর এ সময়ে বেশি ঝড়বৃষ্টি হলেও ভয়াবহতা থাকে কম। তখন মেঘে বৃষ্টি থাকে বেশি এবং মেঘ থাকে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি। বাতাসের গতি থাকে কম এবং তুলনামূলক আর্দ্র ও শীতল। বজ্রপাতও কম। ফলে তখনকার ঝড় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে না। এতে প্রাণহানি হয় কম। ফলে এ নিয়ে মানুষের তত মাথাব্যথা নেই।

অপরদিকে প্রাক-মৌসুমের ঝড়ে থাকে দমকা বাতাস, ঝড়ো হাওয়া, বজ্র, শিলাবৃষ্টি এবং সাধারণ বৃষ্টি। পাশাপাশি মেঘ থাকে বায়ুমণ্ডলে। কালবৈশাখী সৃষ্টি হয় বজ্রমেঘ থেকে। সব মিলে এই ঝড় থাকে অনেক শক্তিশালী। এর তীব্রতা ও ভয়াবহতা অনেক বেশি। এ কারণে এই ঝড়ের ব্যাপারে মানুষের আলাদা মনোযোগ থাকে।

আরো পড়ুনঃ মাওলানা জালালউদ্দীন রুমীঃ আত্মার কবি

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বজ্রঝড়ের উৎস দেশের ভেতরে বা বাইরে দুই জায়গায়ই হতে পারে। দেশের বাইরের উৎস প্রধানত ভারতের পূর্বাঞ্চল বা উত্তর-পূর্বাঞ্চল। উত্তর-পশ্চিমের শুষ্ক ও উষ্ণ বায়ুর সঙ্গে পুবালি ও উত্তর-পশ্চিমের জলীয়বাষ্পসমৃদ্ধ বায়ুর সংমিশ্রণে তৈরি হয় বজ্রমেঘ ও বজ্রঝড়। এ সময় সৃষ্ট মেঘে থাকে প্রচুর বজ্র। সাধারণত বজ্রপাতে বাংলাদেশে প্রচুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশে বজ্রঝড় ও ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে নানা দুর্ঘটনা। ৩১ মার্চ সন্ধ্যায় মৌসুমের প্রথম কালবৈশাখীতে কেবল ঢাকায় ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৌলভীবাজারে নিহত হয়েছে দুই শিশু। ঢাকায় নিহতদের মধ্যে কয়েকজন গাছচাপা এবং দুই শিশু বাড়ির উঠানে খেলা করার সময় বজ্রপাতে নিহত হয়।

আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম জানান, সাধারণত তিন ধরনের বজ্র আছে। একটি হচ্ছে একই মেঘের ভেতরে। আরেকটি পাশাপাশি মেঘে হয়। আর অপরটি বায়ুমণ্ডল থেকে ভূপৃষ্ঠে চলে। শেষের বজ পাতটি সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ। এতে বাংলাদেশে নিহতের সংখ্যা বেশি। সেই বজ পাত, বজ ঝড় আর কালবৈশাখীর মৌসুমই চলছে এখন। এ কারণে জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচতে সতর্কতার বিকল্প নেই।

এদিকে প্রাক-বর্ষা বা কালবৈশাখী এবং বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে নৌদুর্ঘটনা বেড়ে যায়। জানতে চাইলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমডোর এম মাহবুব-উল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নৌপরিবহনের ক্ষেত্রে সারা বছর আমাদের প্রস্তুতি থাকে। আমাদের প্রধান লক্ষ্যই থাকে ফিটনেসবিহীন এবং নকশাবহির্ভূত কোনো জাহাজ বা কার্গো যেন চলাচল করতে না পারে। প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আমরা এটা নিশ্চিত করি। এছাড়া দুর্ঘটনা এড়াতে প্রত্যেক যাত্রীবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে প্রতিটা ভয়েজের (জলযাত্রা) আগে ফিটনেসের ব্যাপারে ঘোষণা দিতে হয়। একটি জাহাজের ভয়েজের জন্য উপযুক্ত মাস্টার, দক্ষ নাবিক, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, ত্রুটিহীন মেশিন, রেডিও-মোবাইল-ওয়্যারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে কি না, সে ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হয়। জাহাজ কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে লিখিত ঘোষণা দেয়। তিনি বলেন, একটি জাহাজের বন্দর ত্যাগের পরও অনেক সময়ে বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সেক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। নিকটস্থ বন্দরে বা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশনা থাকে। রোববার সন্ধ্যায় ঝড়ের উদ্ভবের পরপরই আমরা সব বন্দরে বার্তা পাঠিয়েছিলাম। তবে দুর্ঘটনা রোধে সর্বোপরি জাহাজ কর্তৃপক্ষ এবং যাত্রীদের ভূমিকা থাকতে হয় বেশি। এ কারণে আমরা প্রতিবছর নৌ নিরাপদ সপ্তাহ পালন করি। কয়েকদিন আগে জাহাজ মালিকদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে।