গাদীশাইল থেকে দমদম লেক

গাদীশাইল থেকে দমদম লেক

-এম এ মজিদ-

সরু এবং মেটো পথ, সাথে বৃষ্টি। পিচ্ছিল রাস্তায় অন্তত ২৫টি মোটর সাইকেলে ৫০ জনের যাত্রা। ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার নিয়ে মোটর বহরে যোগ দিয়েছে কেউ কেউ। গন্তব্য গাদিশাইল।

চুনারুঘাট উপজেলার ২নং আহমদাবাদ ইউনিয়নের একটি গ্রাম। সীমান্ত ঘেষা। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপূর। লোভনীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য। চা বাগান, লেক, পরিত্যক্ত রেল স্টেশন ঘেরা কৃষি নির্ভর এ গ্রামে আগে যাওয়া হয়নি। যার বাড়িতে যাচ্ছি তার সাথে আগে দেখা হয়নি, মোবাইল ফোনে কোনো কথাও হয়নি। শুধু আমার না এমন অভিজ্ঞতা দু চার জন ছাড়া সবার। কিন্তু কারো কাছে অপরিচিত নয় সে। যথেষ্ট জনপ্রিয়। তবে মেয়েদের কাছে চক্ষুশোল। তীর্যক বাক্যবানে কাবু করে দেয়ার মতো একজন সে।

কারো কাছে পাগলা মুকিত, কারো কাছে ডাক্তার মুকিত আবার কারো কাছে ভেজাইল্লা মুকিত। আমার কাছে শুধুই একজন বন্ধু, অপরিচিত বন্ধু, কাছের বন্ধু, নাইনটি ফাইভ গ্র“পের বন্ধু। ঢাকা, গাজীপুর, শ্রীমঙ্গল, বানিয়াচং, বাহুবল, হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ বিভিন্ন স্থান থেকে যাওয়া বন্ধুদেরকেও মুকিত কোনো দিন দেখেনি। তারপরও প্রত্যেককে মনে হয়েছে চিরচেনা, কাছের, আপনজন, এটা সম্ভব হয়েছে ব্যাচ ৯৫ সিলেট ডিভিশন পেইজবুক পেইজ এর কারণে।

এডমিন সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু ছিলও আমাদের সাথে। ঢাকা থেকে বাচ্চু এসেছে খালেদ ও সোহেলকে নিয়ে। ফাতেমা এসেছে ঢাকা থেকে স্বামী ছেলে মেয়ে নিয়ে। আসমারা এসেছে শ্রীমঙ্গল থেকে। জাকির এসেছে গাজীপুরের টাকশাল থেকে।

ব্যারিষ্টার সুমন ঢাকা থেকে এসেছে। তবে সে এক ঢিলে দুই পাখি মারার অভ্যাসটা ছাড়েনি। ফুটবল খেলা ছিল চন্ড্রিচড়া চা বাগান মাঠে, সে ছিল প্লেয়ার এবং টিম লিডার। খেলাও হল, মুকিতের বাড়িতেও যাওয়া হল। আবার এই সুযোগে আমাদের সবাইকে তার বাড়িতে নিয়ে মিষ্টি ও চা আপ্যায়িত করল। বলা যায় এক ঢিলে তিন পাখি মারা।

চুনারুঘাট থানার ওসি শেখ নাজমুল হক যোগ দিয়েছে মুকিতের আস্তানায়। আমাদের নষ্টালজিয়া ছিল, শালীনতা ছিল, স্বামী স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে গল্প ছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে অপরিচিত বন্ধুরা আসবে বাড়িতে, তাতে মুকিতকে আলাদাভাবে চিন্তা করতে দেখিনি।

আমি হলে বাড়িটা সাজাতাম, বাথরুমের দরজাটা ঠিক করতাম, বাড়িতে থাকা গরু বাছুরগুলোকে একটা সিস্টেমে রাখতাম। অর্থাৎ আমি বন্ধুত্বে রং দিতাম। মুকিত বন্ধুত্বে রং লাগায়নি। আমি চিন্তা করলাম, আমার কিংবা আমাদের সাথে মুকিতের ঠিক এই জায়গাটাতেই পার্থক্য। সে বন্ধুকে বন্ধুই মনে করে, মেহমান মনে করেনি। যার কারণে কেউ তাকে চিনে না, অথচ তার বাড়িতে সবাই।

খাবারের আইটেমগুলো ছিল চমৎকার। বেগুনের ভর্তা, কুমড়া পাতার ভর্তা, মাছ শুটকি দিয়ে লতা, শুটকি সীমের বিচ এর তরকারী, গরুর গোস্ত ভূনা, মুরগী, মুকি দিয়ে ইলিশ মাছ। অনেকটা ভুপে খাবারের মতো। আমি বারবার চিন্তা করছিলাম, আমরা যে এতো জন আসলাম, সমস্যা হয় কি না। অবশেষে সমস্যা হয়নি। বিকালে আমরা চলে গেলাম দমদম লেকে। সুন্দর লেক। চারদিকে পাহাড়, চা বাগান, লেক এর একটি পাশে ইন্ডিয়া।

বৃটেনে বসবাস করে আসা সৈয়দ নজরুল জানাল- বিদেশ হলে এই লেকটিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক পর্যটকের সমাগম হতো। অথচ আমাদের দেশে এতো চমৎকার একটি লেক অবহেলায় পড়ে আছে। সন্ধার দিকে আমরা চলে আসলাম চন্ডিচড়া চা বাগান মাঠে। ব্যারিষ্টার সুমনের খেলা দেখতে।

ইতিমধ্যে খেলা শেষ, আমরা দেরিতে যাওয়ায় সুমনের দল হেরে গেছে। সেখান থেকে ব্যারিষ্টার সুমনের চুনারুঘাটের বাসায়। বিশাল বাসা। এলাকার ভবিষ্যৎ নেতার বাসা। দৃষ্টি নন্দন হল রুম। দু’তলায় নিয়ে গিয়ে সুমন ফ্লোরে বসালো আমাদেরকে। এখানেও বন্ধুত্বের প্রকৃত ছোয়া পেলাম আমরা। ক্লান্ত শরীরে একজন আরেকজনের উপরেই হেলিয়ে দুলিয়ে বসে পড়ল। একটা সুন্দর দিনের অবসান হল। মুকিত ও সুমনের আস্তানা ছেড়ে আমাদের গন্তব্য এবার যার যার আস্তানা।

লেখকঃ আইনজীবী ও সংবাদকর্মী
হবিগঞ্জ ২৮ আগষ্ট ২০২০
০১৭১১-৭৮২২৩২