চলুন নিকলী হাওর ঘুরে আসি

এম এ মজিদঃ ২০০৪ সালের পর সম্ভবত ২০২০ সালের আগে এতো পানি হয়নি। শহরতলী হলেও আমি পানির রাজ্যেই বড় হয়েছি। তবুও তৃষ্ণা মেটে না। সপ্তাহ খানেক আগে বর্ষার পানি দেখতে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে গেলাম আজমিরীগঞ্জে। গাড়িতে করে আসা যাওয়া। অথৈ পানি। তবে পানিতে নামা হয়নি। দেখলাম সাগর দিঘী।

হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলা সদর তাদেরকে দেখানোর অংশ হিসাবে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ যাওয়া। পানিতে গাঁ না ভেজালে আমার মন ভরে না। সেটা কোথাও গেলে সুইমিং পুল হউক বা প্রাকৃতিক পানি হউক। সাতার কাটা আমার সখও বলা যায়।

এডভোকেট দেওয়ান জাকির হোসেন জাকারিয়া ভাই বললেন- যাবে পানি দেখতে? কোথায় জানতে চাইনি। আর কে যাবে তাও জানতে চাইনি। রাজি হয়ে গেলাম। দিন তারিখ ঠিক হল আমরা ৮ আগষ্ট সকালের দিকে বুল্লা বাজার থেকে স্পিড বোটে পানির রাজ্যে যাব। জানানো হল স্পিড বোটে ৫টি লাইফ জেকেট আছে, আমরা ৬ জন।

আগের দিন রাত তখন ৯টা। সাথে বাল্য বন্ধু এডভোকেট সেলিম থাকলেও মাশাল্লাহ তার স্বাস্থ্য আমার চেয়ে উন্নত। তাছাড়া অন্য ৪ জনের মধ্যে সিনিয়র এডভোকেট আব্দুল হাই, এডভোকেট জসিম উদ্দিন এডভোকেট দেওয়ান জাকারিয়া এবং এডভোকেট জসিম উদ্দিন সাহেবের গেষ্ট হয়ে আসা জাফলং এর পাথর ব্যবসায়ী ছালেক ভাই আমার চেয়ে বয়সে বড়।

৬ জনের মধ্যে আমিই সবচেয়ে নিরীহ এবং ভাগ বাটোয়ারা করলেও যে কেউ বলবে বিপদে পড়লে লাইফ জেকেটগুলো তাদেরই প্রাপ্য, তোমার না। বিপদ তো বলে কয়ে আসে না। মাত্র কিছুদিন আগে হাওরে নৌ ডুবির ঘটনায় ১৮ জন হাফেজের মৃত্যুর দৃশ্যও চোখের সামনে ভেসে উঠল।

অথৈ জল, বিশাল হাওর তার আচরণ বদলে ফেলতে পারে যে কোনো সময়। সাত পাচ ভেবে রাত ১০টার দিকে আমি একটি লাইফ জেকেট কিনে আনলাম। প্রস্তুতি সম্পন্ন। সকাল ৯টার মধ্যে আমরা পৌছুলাম বুল্লা বাজারে।

সেখানে আগ থেকেই স্পিড বোট ম্যানেজ করে রেখেছিল এডভোকেট খোকন গোপ। এলাকায় তার বেশ প্রভাব। সাড়ে ৯টার দিকে স্পিড ছাড়লো চালক সেলিম। গন্তব্য নিকলী হাওর, চামড়া বন্দর, মিঠামইন, ইটনা, অষ্ট্রগ্রাম, আদমপুর হয়ে বুল্লা।

অষ্ট্রগ্রাম গিয়ে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামি সেতুতে গিয়ে কয়েকটি ছবি তুললাম। এরপরই নিকলী হাওর। এতো বড় হাওর আমি জীবনেও দেখিনি। নিকলী হাওরের মধ্যখান থেকে আসলে কোনো জনপথই দেখা যায় না। শুধু পানি আর পানি। অনেক ঢেউ। বিপদকে সাথে নিয়েই আপনাকে চলতে হবে। স্পিড বোটকে দুর থেকে যে কেউ মনে করতে পারে পানির নিচ দিয়ে চলে যাচ্ছে কোনো একটি ছোট জলযান।

গভীর জলরাশিতে মৃত্যুঝুকি একেবারেই কম নয়। নিকলী উপজেলা সদরের পাশ দিয়ে আমরা চলে গেলাম চামড়া বন্দরে। বেশ বড় নৌ বন্দর। অনেক জাহাজ নোঙ্গর করা। গভীর জল থেকে মাছ শিকার করে বন্দরে বিক্রি করছেন জেলেরা। দুরের রাস্তা। ওইখানে যে মাছটি জীবিত তা বাসায় আসতে আসতে নিশ্চিত মৃত কিংবা পচে যাবে। চামড়া বন্দর থেকে মাছ না আনাই ভাল।

চামড়া বন্দরে আমি পানিতে নামলেও অন্য কেউ নামেনি। চামড়া বন্দর থেকে চলে আসলাম আমরা মিঠামইন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সাহেবের বাড়িতে। এক অজপাড়া গায়ে জন্ম নেয়া বালক হয়ে গেলেন এক ইতিহাস।

পুরাতন বাড়ির পাশাপাশি কিছু নতুন ভবন করা হয়েছে মহামান্য রাষ্ট্রপতির থাকার জন্য। তার বাড়ির সামনের ১শ ফুট দুরুত্বে নির্মাণ করা হচ্ছে ক্যান্টনমেন্ট। মাটির লেভেল থেকে কমপক্ষে ত্রিশ ফুট উচ্চতায় নির্মিতব্য ক্যান্টেনমেন্টটি হবে ভাটি অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষন। মিঠামইন বাজারে আমরা আইল মাছ ও ছোট মাছ দিয়ে ভাত খেলাম। তাজা মাছ হলেও রান্নার মান তেমন ভাল না।

শতশত পর্যটক রাষ্ট্রপতির বাড়ি দেখছেন। রাষ্ট্রপতির বাড়িটিকে আসলে ঢাকার বঙ্গভবনের ছোয়া দেয়া হয়েছে। সীমানা পিলারগুলো প্রায় একই ধরনের। তাছাড়া বাড়ির সামনে রয়েছে ৪০ ফুট গভীরের নয়নাভিরাম এক পুকুর। ইটনা মিঠামইন অষ্ট্রগ্রামের বিশাল সড়কে এসে আমার মনে হল এলাকার প্রতি কতটুকু দরদ থাকলে একজন মানুষ হাওরের বুক ছিড়ে বিশাল রাস্তা করতে পারেন।

এতো দীর্ঘ, এতো উচু, এতো নয়ন জুড়ানো রাস্তার স্বপ্ন হয়তো প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ সাহেবও কোনো সময় দেখেননি। রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে রাষ্ট্র বিশাল বাজেটে যে রাস্তাটি করেছে, ক্যান্টনমেন্টের মতো বিশাল ও স্পর্শকাতর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, সত্যি প্রশংসনীয়।

আমার মনে হয় কোনো সময় যদি অতি বন্যায় হাওরাঞ্চলের গ্রামগুলো তলিয়ে যায় অন্তত ১০/১২ লাখ মানুষ নির্ধিদ্বায় সড়কে আশ্রয় নিতে পারবে। শতশত পর্যটক হাওরের বুক ছিড়ে চলে যাওয়া সড়কে আসছে, বিশাল হাওরের পানিতে গোসল করছে।

এডভোকেট জাকারিয়া ভাই ছাড়া আমরা সবাই পানিতে এক ঘন্টারও বেশি সময় সাতরিয়েছি। সাথে লাইফ জেকেট। যে কোনো অঘটনের আশংকায় স্পিড বোটটি পাশাপাশি থেকেই আমাদেরকে নজরে রাখছিল।

মিঠামইন থেকে আদমপুর আসার পথে ঘটল অন্য ঘটনা। আমরা আসছিলাম বাতাসের উল্টোদিকে। আকাশের অবস্থাও ভাল ছিল না। বিশাল ঢেউ যখন আচড়ে পড়ছিল স্পিডবোটে, তখন মনে হচ্ছিল যে কোনো সময় স্পিড বোটটি উল্টে যেতে পারে। চালকও অনেকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল।

একটি গ্রামের পাশাপাশি পৌছা পর্যন্ত আমরা আতংকের মধ্যেই ছিলাম। পরে আদমপুর বাজার। সেখানে কোনো মাছ কেনা হয়নি। বিকাল ৫টার দিকে বুল্লা বাজার। আমাদের চেহারার পরিবর্তন ছিল লক্ষ্যনীয়। সান বার্ণ এ চেহারা পুড়ে যায়। যদিও ৪০ এসপিএফ সান স্ক্রিণ আমাদের সাথে ছিল।

লেখকঃ আইনজীবী ও সংবাদকর্মী