মারমুখী নয়, পুলিশ থাকবে সতর্ক

করাঙ্গীনিউজ: জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগ- পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বর্তমান সরকারের পক্ষে কাজ করছে।

নির্বিচারে তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মোখলেসুর রহমান, র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ এবং ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ ৭০ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার বদলি চেয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠিও দিয়েছে তারা।

এমন প্রেক্ষাপটে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পুলিশ সদর দফতর থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি সারা দেশে পুলিশের সব রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার, বিভিন্ন ইউনিট প্রধান এবং এসপিদের কাছে পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্বাচনকে ঘিরে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের প্রতি অযথা মারমুখী আচরণ করা যাবে না। ফৌজদারি অপরাধ ছাড়া কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা যাবে না। পাশাপাশি হটস্পট চিহ্নিত করে টহল জোরদার করার নির্দেশও দেয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেউ যদি নির্বাচনের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্ন করার চেষ্টা করে তাহলে তাকে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া যাবে না। এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, পেশাদার অপরাধীদের গ্রেফতার অভিযান জোরদার করতে হবে। মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজিদের ১২ ঘণ্টা পর পর দায়িত্বরত এলাকার তথ্য হালনাগাদ করে তা সদর দফতরে জানানোর পাশাপাশি কোনো বাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়া এলে তাদের তথ্য সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে কার্যকর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, মাঠ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের শতভাগ নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে চলমান বিশেষ অভিযানও অব্যাহত থাকবে।

পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে পুলিশ কোনো পক্ষপাতিত্ব করবে না। অনেকেই মনে করছেন, পুলিশ হয়তো বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় বসাতে সহায়তা করবে।

কিন্তু এ ধারণা ভুল। পুলিশের পক্ষে এটা সম্ভব না। সারা দেশে নির্বাচনী কেন্দ্র ৪০ হাজারের বেশি। কিন্তু পুলিশের সংখ্যা ২ লাখেরও কম। এসবের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার পুলিশ সদস্যকে ভিআইপি ডিউটিসহ অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে।

নির্বাচনী কাজে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে মেট্রোপলিটন কেন্দ্রগুলোতে এক বা একাধিক এসআই বা এএসআই পদমর্যদার কর্মকর্তা মোতায়েন করা যেতে পারে।
কিন্তু জেলা পর্যায়ের কেন্দ্রগুলোতে কোনো পুলিশ অফিসার মোতায়েন করা সম্ভব না। সেখানে প্রতি কেন্দ্রে একজন কনস্টেবল নিয়োজিত থাকবেন। মানুষ ভোট দিতে গেলে একজন কনস্টেবলের পক্ষে সেখানে অন্যায় আচরণের মাধ্যমে কোনো কিছু করা সম্ভব না।

উদাহরণ দিয়ে পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের এ কর্মকর্তা বলেন, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ডিসি এবং এসপি পর্যায়ের বেশিরভাগ কর্মকর্তা ছিল ১৯৭৩ সালের ব্যাচের। একইভাবে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ডিসি এবং এসপি পর্যায়ের বেশিরভাগ কর্মকর্তা ছিল ১৯৭৯ সালের ব্যাচের। আশঙ্কা থাকলেও ওই দুটি নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রভাব বিস্তার করে ফলাফল পাল্টে দিতে পারেনি। তাই এবারও এ ধরনের আশঙ্কা করা হলে সেটি ভুল প্রমাণিত হবে। এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে পুলিশ সদর দফতর থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দফতরের অপর একজন প্রভাবশালী অতিরিক্ত আইজি বলেন, যেসব পুলিশ সদস্যের চাকরির মেয়াদ শেষ পর্যায়ে (সর্বোচ্চ ২ বছর আছে) তারা রিস্ক নিতে চাইলেও যাদের চাকরির মেয়াদ অনেকদিন রয়েছে তারা রিস্ক নিতে রাজি না। এসপিদের চাকরির মেয়াদ ১০ থেকে ১৫ বছর আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা জানে যে, কারও বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার পরও যদি তারা ক্ষমতায় এসে পড়ে তাহলে তার চাকরিতে সমস্যা হবে। তাই তারা নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী। তাছাড়া পুলিশ সদর দফতর থেকেও একই ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

অতিরিক্ত ডিআইজি (ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স) মনিরুজ্জামান বলেন, বিশেষ কারণে ২০১৪ সালের নির্বাচনে পুলিশ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হয়েছিল। এবার ওই ধরনের কোনো পরিস্থিতি হয়নি। তাই বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর পুলিশ সদস্যদের মারমুখী হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, গতবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বানচাল করতে চেয়েছিল। আর পুলিশের চ্যালেঞ্জ ছিল নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করা। এবার যেহেতু সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তাই নির্বাচন বানচালের মতো কোনো পরিস্থিতি কেউ তৈরি করছে না।

একই ধরনের তথ্য জানিয়ে পুলিশের একজন ডিআইজি বলেন, মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং দলটির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ক’দিন ধরেই ঝামেলা চলছে। ভাংচুরের ঘটনাও ঘটছে। ইচ্ছা করলে পুলিশ সেখানে গিয়ে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করতে পারত। কিন্তু সেটাও করা হয়নি। এ থেকেও বোঝা যায়, নির্বাচনকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকা কী হতে যাচ্ছে। ওই ডিআইজি বলেন, আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সে সরকারের নির্দেশ মেনে চলব।

এটাই স্বাভাবিক। বর্তমান সরকার ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। এ সরকারের আমলে আমরা অনেক কাজ করেছি। কাজের মাধ্যমেই সরকারের আস্থা অর্জন করেছি। ভবিষ্যতে যদি অন্য সরকার ক্ষমতায় আসে আমরা তাদের নির্দেশ মেনে চলব।