সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
25.7 C
Habiganj

দীর্ঘ যুগ পর অর্থমন্ত্রীবিহীন সিলেট

হবিগঞ্জ  নিউজ: যেকোন সরকারেরই উন্নয়নের অন্যতম চালিকা শক্তি অর্থমন্ত্রণালয়। আর গত ১০ বছর সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন সিলেটের সন্তান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। টানা ১০ বছর তিনি দায়িত্ব পালনকালে সিলেটের উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেও অবিশ্বাস্য মাত্রায় নিয়ে যান।

গত ২৮ বছর ধরে সকল সরকারের আমলেই অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন ‘সিলেটী’রা। দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করায় অন্ত্রমন্ত্রনালয় মানেই সিলেট- এমন ধারণাও তৈরি হয়েছিলো রাজনীতিতে। তবে ২৮ বছর পর এবার এর ব্যতিক্রম ঘটতে যাচ্ছে।

সোমবার শপথ নিতে যাওয়া মন্ত্রীপরিষদে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত সাংসদ আ হ ম মোস্তফা কামাল। ফলে সিলেট থেকে কুমিল্লায় যাচ্ছে অর্থমন্ত্রণালয়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মন্ত্রিত্ব নিয়ে সিলেটবাসীর জল্পনার অন্ত ছিল না। অর্থমন্ত্রী নিজেও জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী চাইলে তিনি আরো কিছু দিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে তিনি নিজ থেকে এবার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
সিলেট আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা নিজেদের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে অবস্থান সুসংহত করে রেখেছেন। এ কারণে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সিলেটের মন্ত্রীরা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে যেতে পারেন।
তবে-এবার চমক দেখিয়েছেন জাতিসংঘ মিশনে দীর্ঘদিন দায়িত্বপালনকারী সদ্য নির্বাচিত ড. একে আবদুল মোমেন। তাকে এবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হতে পারে এমন গুঞ্জন ছিল। আর সেই গুঞ্জনই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এর কারণ- ড. একে আবদুল মোমেন দেশ-বিদেশে এতদিন বাংলাদেশের সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। ফলে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করতে পারবেন।

সব মিলিয়ে ১১টি বাজেট পেশ করেছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। তার চেয়ে বেশি বাজেট বাংলাদেশে একজনই দিয়েছেন। তিনি হলেন বিএনপির অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। তিনি দিয়েছেন ১২টি বাজেট।
গত ১০ বছর ধরে বাজেট দিয়ে আসছেন মুহিত। সর্বোচ্চ সংখ্যক বাজেটের রেকর্ড সাইফুরের থাকলেও টানা বাজেট দেয়ার রেকর্ড কিন্তু মুহিতেরই।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ অর্থমন্ত্রীর জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করি। আশা করি তিনি হবেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী।’
মুহিত প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন ১৯৮২ সালে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে। পরের বছরও তিনিই ঘোষণা করেন সরকারের বার্ষিক আয় ব্যয়ের হিসাব।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর টানা ১০ বছর বাজেট ঘোষণা করেন মুহিত।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৮০ ও ১৯৮১ সালের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন বিএনপির প্রয়াত নেতা সাইফুর রহমান। এরপর ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত টানা পাঁচটি এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আবারও টানা পাঁচটি বাজেট ঘোষণা করেন তিনি।

আবুল মাল আবদুল মুহিত
সিলেট জেলা মুসলিম লীগের নেতা আবু আহমদ আব্দুল হাফিজের দ্বিতীয় ছেলে মুহিত ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করার পর অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ডে উচ্চ শিক্ষা নেন। ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার পর তখনকার পাকিস্তান এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেন মুহিত।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ার কারণে কারাভোগ করা মুহিত ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় ছিলেন পাকিস্তানের ওয়াশিংটন দূতাবাসে কূটনৈতিক দায়িত্বে। জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর ১৯৭২ সালে পরিকল্পনা সচিবের দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিবের হন মুহিত। ১৯৮১ সালে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে গিয়ে ‘অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে কাজ শুরু করেন ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও আইএফএডি-তে।
দীর্ঘদিন বিশ্ব ব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করার পর দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন মুহিত।
মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন রাজনীতি এবং স্মৃতিকথা নিয়ে ২৩টি বই ইতোমধ্যে লিখেছেন মুহিত।

এম সাইফুর রহমান
বাংলাদেশের একজন অর্থনীতিবিদ এবং রাজনীতিবিদ যিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সর্বোচ্চ ১২ বার বার্ষিক অর্থ বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী হলেন সাইফুর রহমান। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন নেতা ছিলেন যিনি সর্বোচ্চ সময়কালীন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী। তিনি ১৯৮০-৮১, ১৯৯১-১৯৯৫ এবং ২০০২-২০০৬ সালে দীর্ঘ মন্ত্রীজীবনে ডিসেম্বর, ১৯৭৬ থেকে অক্টোবর, ২০০৬ পর্যন্ত তিনটি সরকারের আমলে ১২টি জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন। মন্ত্রিত্বের প্রথম তিন বছরে তিনি ব্যবসায় এবং বাণিজ্য মন্ত্রী ছিলেন, এবং পরবর্তী ১২ বছর তিনি অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৪ সালে, তিনি স্পেনের মাদ্রিদে বিশ্ব ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সুবর্ণ জয়ন্তী সম্মেলনের গভর্ণর নির্বাচিত হন।
২০০৫ সালে, রহমানকে একুশে পদক, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। সাইফুর রহমান ৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে সিলেট থেকে ঢাকা আসার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় তৎক্ষণাৎ মারা যান।

শাহ এ এম এস কিবরিয়া
১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের বৈদেশিক বিভাগে যোগদান করে কিবরিয়া পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক বিষয়ক বিভাগের মহাপরিচালক হয়েছিলেন। ১৯৮১-১৯৯২ সালের মধ্যেকার সময়ে তিনি জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কমিশন (এসকাপ)-এর প্রধান নির্বাহী ছিলেন। এছাড়াও, অর্থমন্ত্রী হিসেবে কিবরিয়া ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে এম.পি বা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
শাহ কিবরিয়া জানুয়ারি ২৭, ২০০৫ তারিখে তার নির্বাচনী এলাকা সিলেটের হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলায় মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।
এবার অর্থমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে আ হ ম মোস্তফা কামালের নাম। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ যুগের অবসান ঘটলো বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। সিলেটের বাইরে থেকে অর্থমন্ত্রী পেল দেশ। অবসান হলো এক দীর্ঘ যুগেরও বেশি সময়। আবার অন্য ভাবে বলা যায়, বাংলাদেশকে শক্ত ভিতের ওপর দাড় করিয়ে দিয়েছেন সিলেটের কৃতি সন্তানরা। এবার বাংলাদেশের বিশ্ব জয়ের প্রহর।

প্রিয় পাঠক

আপনার আশেপাশের যে কোন সমস্যার কথা আমাদেরকে লিখে পাঠান। এলাকার সম্ভাবনার কথা, মাদক, দুর্নীতি, অনিয়ম আর সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ পাঠিয়ে দিন আমাদের ই-মেইলে। ই-মেইলঃ habiganjnews24@hotmail.com

95,640FansLike
1,432FollowersFollow
2,458FollowersFollow
2,145SubscribersSubscribe