দেশে নিয়ে আসা হল মেজর জেনারেল (অব.) হবিগঞ্জের সি আর দত্তের মরদেহ

দেশে নিয়ে আসা হল মেজর জেনারেল (অব.) হবিগঞ্জের সি আর দত্তের মরদেহ

মুক্তিযুদ্ধকালীন ৪নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) চিত্ত রঞ্জন (সি আর) দত্ত বীর উত্তমের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল পৌনে ৯টার দিকে এমিরেটস্ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তার মরদেহ দেশে আনা হয়।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তথ্যটি জানানো হয়। বিমানবন্দর থেকে স্থানান্তর করে জেনারেল দত্তের মরদেহ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) হিমাগারে রাখা হয়েছে।

পরে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় তার বনানী ডিওএইচএসের ২নং সড়কের ৪৯নং বাড়ি হয়ে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনার্থে ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বরে নিয়ে যাওয়া হবে এই সেক্টর কমান্ডারের মরদেহ। সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করা হবে।

ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বর থেকে বেলা ১১টায় মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে রাজারবাগ শ্মশানে। সেখানে শেষ কৃত্যানুষ্ঠানের আগে জেনারেল দত্তের মরদেহের প্রতি সামরিক সম্মাননা জ্ঞাপনের জন্য গানস্যালুট প্রদান করা হবে।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এবং হবিগঞ্জে তার নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

চিত্ত রঞ্জন দত্ত (সি আর দত্ত) ,বীর উত্তম এর সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ

(জন্ম: ১ জানুয়ারি, ১৯২৭)

তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার।

চিত্ত রঞ্জন দত্তের জন্ম আসামের শিলংয়ে। তার পৈতৃক বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে। তার বাবার নাম উপেন্দ্র চন্দ্র দত্ত এবং মায়ের নাম লাবণ্য প্রভা দত্ত। শিলং-এর ‘লাবান গভর্নমেন্ট হাইস্কুল’ -এ দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন৷ পরবর্তীকালে বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে হবিগঞ্জে এসে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন৷ হবিগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে তিনি মাধ্যমিক পাশ করেন। পরবর্তীতে কলকাতার আশুতোষ কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন৷ পরবর্তীতে খুলনার দৌলতপুর কলেজের বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন৷ পরে এই কলেজ থেকেই বি.এস.সি পাশ করেন৷

চিত্ত রঞ্জন দত্ত ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন৷ কিছুদিন পর ‘সেকেন্ড লেফটেনেন্ট’ পদে কমিশন পান। ১৯৬৫ সালে সৈনিক জীবনে প্রথম যুদ্ধে লড়েন তিনি৷ ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে আসালং এ একটা কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেন তিনি৷ এই যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার তাকে পুরস্কৃত করে৷

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেব দায়িত্ব দেয়া হয় এম.এ.জি ওসমানীকে। তিনি বাংলাদশেকে মোট ১১টি সেক্টরে ভাগ করে নেন৷ সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল এবং খোয়াই শায়েস্তাগঞ্জ রেল লাইন বাদে পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট ডাউকি সড়ক পর্যন্ত এলাকা নিয়ে ৪নং সেক্টর গঠন করা হয় এবং এই সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন চিত্ত রঞ্জন দত্ত৷ সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর হবিগঞ্জের রশীদপুরে প্রথমে ক্যাম্প বানান তিনি৷ চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চা বাগান৷ চা বাগানের আড়ালকে কাজে লাগিয়ে তিনি যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করে দিতেন৷

পরবর্তী সময়ে তিনি যুদ্ধের আক্রমণের সুবিধার্থে রশীদপুর ছেড়ে মৌলভীবাজারে ক্যাম্প স্থাপন করেন৷মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য চিত্ত রঞ্জন দত্ত বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন৷ চিত্ত রঞ্জন দত্ত ছিলেন বাংলাদেশ রাইফেলসের প্রথম ডাইরেক্টর জেনারেল। বর্তমানে এ বাহিনীর নাম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ রাইফেলস্) এর প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন সি আর দত্ত বীর উত্তম।

মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সি আর দত্ত বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। রাজধানীর কাঁটাবন থেকে কারওয়ান বাজার সিগন্যাল পর্যন্ত সড়কটি ‘বীরউত্তম সি আর দত্ত’ সড়ক নামে নামকরণ করা হয়