ধূমপান রোধে চাই কঠোর আইন

ধূমপান রোধে কঠোর আইন করা হোক

আল-আমিন আহমেদ জীবনঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকসহ মোটামুটি সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত যে, ধূমপান যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা রোগের অন্যতম প্রধান কারণ, ধারক ও বাহক।

বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সি ৪ কোটি ১৩ লাখের অধিক মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক সেবন করছে। তারা পরোক্ষভাবে ক্ষতি করছে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ মানুষের।

ধূমপান না করেও কেউ যেন পরোক্ষভাবে এর কুফলের শিকার না হন, এ লক্ষ্যে প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়। আইনে সরকারি ও বেসরকারি কার্যালয়সহ ২৪ ধরনের স্থানকে পাবলিক প্লেস ঘোষণা দিয়ে সেসব জায়গায় ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আইনে খোলা জায়গা বলাহয়েছে পার্ক, মাঠ, বাস টার্মিনাল, স্টেশন, লঞ্চঘাট, রেস্তোরাঁ, খাওয়ার জায়গা, যেখানে মানুষ জড়ো হয় সেখানে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তাছাড়া আইনে শিশুসহ অধূমপায়ীদের পরোক্ষ ধূমপান থেকে রক্ষায় কঠোর বিধান থাকলেও তা কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই ধূমপানের পথ ধরে নেশায় জড়িয়েছে।

একজন ধূমপায়ীর সাধারণত একাধিক ধূমপায়ী বন্ধু থাকে। আর এভাবেই একজনের প্রভাবে অন্য বন্ধুরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। একবার যখন কেউ কোনো মাদক গ্রহণ করে, তখন সে একটার পর একটা বিভিন্ন ধরনের মাদক গ্রহণ করতে থাকে।

পরিণতিতে একসময় মৃত্যুই হয়ে ওঠে এদের জীবনের অবশ্যম্ভাবী নিয়তি। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে সবচেয়ে ঝুঁঁকিতে রয়েছে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা।

পরম নির্ভরতায় শিশুটি বাবার পাশে বসে খেলছে। আর ধূমপায়ী বাবাই কি না শিশুটির সবচেয়ে ক্ষতির কারণ হচ্ছে না বুঝেই। শিশুরা এতে হার্ট অ্যাটাক, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিগারেটের ধোঁয়ায় শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। তাই শুধু পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহন নয়, বাসায়ও ধূমপান পরিহার করা উচিত।

অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ধূমপায়ীর ধূমপানকালীন কোনো অধূমপায়ী উপস্থিত থাকলে তারও একই সমস্যা দেখা দেবে। সিগারেটের ধূমপানে নিকোটিনসহ ৫৬ টি বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বিরাজমান।

২০১০ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বের ১৯২ দেশে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের ধূমপানের (পরোক্ষ ধূমপান) প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ মানুষ মারা যায়।

এর মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার হলো শিশু। শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের কারণে নিউমোনিয়া ও অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে ঝুঁঁকে পড়ে। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগও দেখা দেয়।

তামাক ও মাদক যে কোনো মারণাস্ত্রের চেয়ে ভয়াবহ। তামাক ও মাদকের নেশা যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী ধূমপান ও তামাকের নেশার মাধ্যমে অর্থ ব্যয় করছে। এতে একদিকে তারা অসুস্থ হচ্ছে, কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে। এতে তাদের সমস্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি দেশেরও ক্ষতি হচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও ধূমপানবিরোধী বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বিভিন্ন স্তর মারফত জানা যায়, ধূমপান আইন মেনে না চলার প্রবণতা, জরিমানার পরিমাণ কম হওয়া এবং তামাক উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপট এসব কারণে আইন প্রয়োগে হিমশিম খাচ্ছে সরকার।

২০১৩ সালের তামাক আইনের আইন অনুযায়ী ওইসব স্থানে ধূমপায়ীকে অনধিক মাত্র ৩০০ টাকা জরিমানা করতে হবে, যা আইনের মধ্যেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ নেই।

প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে আইনের বিচারে এমন জরিমানা কঠিন পদক্ষেপের কোনো অংশই হতে পারে না। আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতার কারণেই আইনের প্রতি অনেকেই শ্রদ্ধাশীল হচ্ছেন না।

একমাত্র বিড়ি, সিগারেট বা তামাক জাতীয় পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো হয়তো সরকারি আইনের প্রতি লোকদেখানো শ্রদ্ধার অংশ হিসেবে প্যাকেটের গায়ে ধূমপানের কুফল সংক্রান্ত দু-একটা ছবি ও বাক্য লিখে থাকে।

ধূমপান রোধে কঠোর আইন করা হোক

অন্যদিকে পাকিস্তান, ফিলিফাইন ও শ্রীলঙ্কায় প্রকাশ্যে ধূমপান করলে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। এছাড়া তামাকজাত দ্রব্য বেচাকেনা এবং ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রথম দেশ হিসেবে রেকর্ড করেছে তুর্কমেনিস্তান।

সরকারের রাজস্বে এ খাত থেকে একটা মোটা অঙ্ক যোগ হচ্ছে। তাই আমাদের দেশে একেবারে বন্ধ না হোক অন্তত প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধ করা যেতে পারে! তাই আমাদের দেশেও প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে মোটা অঙ্কের জরিমানার বিধান তৈরি ও এর সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।

যেখানে-সেখানে, ফুটপাতে অবাধে বিড়ি সিগারেট বিক্রি বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। মূলত তামাকের ব্যবসা বৈধ হলেও অনৈতিক। তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে সব তামাকের ওপর উচ্চহারে কর বাড়াতে হবে।

কারণ সব তামাকই মানুষকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে। ভারত থেকে সীমান্ত এলাকা দিয়ে নেশা জাতীয় এক ধরনের পাতার বিড়ি বাংলাদেশে প্রবেশ করে, সেটাও বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসকদের মধ্যে ধূমপানের নেশা কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডকেও পদক্ষেপ নিতে হবে।

আশার কথা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন; তার এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। সচেতন জনসাধারণ চায় সরকার যেন দ্রুতই প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও এর প্রয়োগ নিশ্চিত করে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিবেশ সৃষ্টি করে।

লেখকঃ সাবেক ছাত্র, হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজ।