বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল জাতীয় রাজনীতির শ্রেষ্ঠ কবিতা

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল জাতীয় রাজনীতির শ্রেষ্ঠ কবিতা

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল জাতীয় রাজনীতির শ্রেষ্ঠ কবিতা। কিছু মানুষ প্রশ্ন তুলেন বঙ্গবন্ধু কেন ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। অথচ ভাল করে ভাষণটি পড়লেই দেখা যাবে এর ভিতরেই স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল।

স্বাধীন কথাটি সরাসরি না বলার জন্য চাপ ছিল। কারণ এতে করে বাংলার আকাশের উপর থেকে লক্ষ লক্ষ গোলা নিক্ষেপ হত। এমনকি ১০ থেকে ২০ লাখ লোকের প্রাণহানি হত তখন। যদিও ছাত্রলীগ ও যুবকদের চাপ ছিল সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাবেক একান্ত সচিব ড. ফরাস উদ্দিন শনিবার সন্ধ্যায় ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে স্মৃতিচারণ ও গুণিজন সম্মাননা অনুষ্ঠানে একক বক্তৃতা প্রদানকালে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. ফরাস উদ্দিন আরও বলেন, আমাদের শতজনমের সৌভাগ্য যে আমরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছিলাম। তার কারণেই আমরা একটি মানচিত্র, ভুখন্ড ও রাজনীতি করার পরিবেশ পেয়েছি। বিশেষ  একটি মর্যাদাবান জাতি হতে পেরেছি। তিনি সব সময় সাধারণ মানুষের পাশে থাকতেন এবং মিশতেন।

শিশুদেরকে বেশী ভালবাসতেন। তার জন্মদিনে শিশুরা আসলে আনন্দিত হতেন বেশী। জন্মদিনে জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, আব্দুর রাজ্জাক, নিলিমা ইব্রাহিম, আব্দুল্লা আল মুতি শরফুদ্দিনরা আসতেন। তিনি শিশুকালে ডানপিঠে হলেও ছিলেন দয়ালু এবং সৎ।

সবাই বলে সোওরাওয়ার্দী তার রাজনৈতিক গুরু। আমার এখানে দ্বিমত হল তিনি তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন। তবে তার রাজনৈতিক গুরু তিনজন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, আব্দুল হাশিম ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। তবে বসুর সহিংস দিকটি তিনি পরিহার করতেন।

নেতাজী বলেছিলেন ‘‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি স্বাধীনতা দিব’’ আর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দিব’’। এখানেই তাদের দর্শনের পার্থক্য।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর কেন ৯৫ হাজার আত্মসমর্পণকারীকে আটক করা হয়নি এবং বিচারের আওতায় আনা হয়নি। বঙ্গবন্ধু তখন চিন্তা করেছিলেন পাকিস্তানে আটক আমাদের ৫ লাখ লোকের কি অবস্থা হবে। যেখানে ড. ইব্রাহিম আর এস এ কামাল এর মত লোক ছিলেন।

১৯২১ সালে যদি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় না হত তাহলে এখানকার লোকজন শিক্ষিত হত না এবং বঙ্গবন্ধুও সৃষ্টি হত না। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও লক্ষ্যের পথে অবিচল। তিনি পরিকল্পনা এবং কৌশল বদল করলেও লক্ষ্য কখনও পরিবর্তন করেননি।

১৯৪৭ সালেই তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের। তিনি সংকল্পের দিক থেকে ছিলেন কঠোর আর মনের দিক থেকে নরম। ইস্পাত কঠিন এই মানুষ কারও কাছে মাথা নত করার মানুষ ছিলেন না। আর তিনি ছিলেন প্রচন্ড জাতীয়তাবাদী। আর জাতীয়তাবাদীরা কখনও পালিয়ে যায় না। বঙ্গবন্ধু কখনও পালিয়ে যাননি।

ড. ফরাস উদ্দিন বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সারা বিশ্বে  ছিলো মহামন্দা। শস্যের খড়া এবং মূল্যস্ফীতির কারণে ধানের দাম ৩গুণ, গমের দাম আড়াইগুণ আর পেট্রলের দাম বাড়ে তিনগুণ।

বঙ্গবন্ধু টিসিবি গঠন আর কৃষকদের লক্ষাধিক সার্টিফিকেট মামলা তুলে নিয়েছিলেন। কৃষিতে ভর্তুকী দিয়েছিলেন। ৭৪-৭৫ সালে প্রবৃদ্ধি হয় ৭.৮ ভাগ। তবুও হায়েনার দল তাকে পছন্দ করেনি। বাকশাল নিয়ে অনেকেই জড়োসড়ো হলেও আমি মনে করি বাকশাল প্রোগ্রাম খুব প্রয়োজন ছিল।

ঢাকা থেকে শাসন সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন জমির আইল তুলে দিয়ে সমবায় ভিত্তিক কৃষি করার। কিন্তু মানুষকে এ ব্যাপারে ভুল বোঝানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশে অরাজকতা হয়েছে। পরে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে দেশের প্রবৃদ্ধিকে ৮.১৩ ভাগে নিয়ে যান। যা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তিনটি প্রবৃদ্ধির একটি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিকে প্রশংসা করেছেন ভারতের নোবেল বিজয়ী অমর্ত্যসেন ও পাকিস্তানী অর্থনীতিবিদ মাহবুবুল হক। বাজার অর্থনীতিতে দ্রুত সমৃদ্ধি আনতে হলে কিছু বৈষম্য হবে।

সামনে বাংলাদেশের অর্থনীতির মডেল হবে শিল্প নির্ভর। আমাদেরকে বস্ত্রখাতে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ বছরে আমাদেরকে ৬শ’ কোটি ডলারের বস্ত্র আমদানী করতে হয়। বস্ত্র শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে।

এতে করে স্ব-কর্মসংস্থান হবে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে। আয় রোজগার বৃদ্ধি পাবে। এতে করে দারিদ্র এবং বৈষম্য কমবে।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার স্পেশাল ইকনোমিক জোন নিয়ে তিনি বলেন, শুনেছি এই ইকনোমিক জোন নিয়ে অনেকেই ষড়যন্ত্র ও দলবাজি করছে। এটি বাস্তবায়ন করা জরুরী।

এখানেই বস্ত্র শিল্প হতে পারে। হবিগঞ্জের মাটিতে বস্ত্র শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র শিল্প বিকাশের ভাল সম্ভাবনা রয়েছে।

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক নুরুল ইসলাম, হবিগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাচ্ছিরুল ইসলাম, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান শহীদ উদ্দিন চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে ৭ মার্চের ভাষণের উপর প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ড. ফরাস উদ্দিনকে ক্রেস্ট ও উত্তরীয় প্রদান করা হয়।