২৬ অক্টোবর (সোমবার) ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ
28 C
Habiganj
২৬ অক্টোবর (সোমবার) ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ
হোম উপসম্পাদকীয় বাংলাদেশে ধর্ষণের রূপরেখা

বাংলাদেশে ধর্ষণের রূপরেখা

যুবায়ের বিন আখতারুজ্জামানঃ উইঘুরদের মত অনেকটা বাঙালিরাও একটা খোলা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আবদ্ধ। তবে এখানে বলির পাঠা অধিকাংশ নারীরা। আশাকরি বুঝতে পারছেন কি নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি। নারীদের প্রতিরোধ করার মত ক্ষমতা থাকলে বিষয়টা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব হতো; কিন্তু যেহেতু তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতার বাইরে তাই এটাকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সাথে তুলনা করছি।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০১৯ : আসকের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে একটি তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৭ সালে দেশে ৮১৮টি ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও ২০১৮ সালে তা কিছুটা কমে ৭৩২ এ নেমে আসে। চলতি বছর (২০১৯) সালে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ২০১৯ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪১৩ নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৬ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন।

বাংলাদেশ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত বছর ৫ হাজার ৪০০ নারী এবং ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি এবং নারী ধর্ষণের মামলা ছিল ৩ হাজার ৯০০টি। পুলিশের হিসাব বলছে, গত বছর ধর্ষণের কারণে ১২ শিশু এবং ২৬ জন নারী মারা যান। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ২১ নারী ও ১৪ শিশু।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম জানাচ্ছে, ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি মাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া এক বছরে যৌন নির্যাতন বেড়েছে ৭০ শতাংশ। গত বছর যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১ হাজার ৩৮৩ শিশু। ২০১৮ সালের চেয়ে গত বছর শিশু ধর্ষণ ৭৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বেড়েছে।

এবার একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন। যৌন নির্যাতনের সংখ্যাগুলো কেমন যেন চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। ধর্ষণের এরূপ জনপ্রিয়তা দেখে বলা যায় এদেশে ধর্ষণের সংস্কৃতি চলছে। ‘ধর্ষণের সংস্কৃতি’ বলতে এমন এক সংস্কৃতিকে বোঝানো হয়, যেখানে সমাজের প্রত্যেক নারী, শিশু কিংবা কিশোরী বালিকা ধর্ষণের মতো পরিস্থিতির শিকার হতে পারে। আর দেশের বিচারবিভাগের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় তারা এতে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে।

ডয়েচে ভেলের তথ্যানুযায়ী, বিদেশি সমীক্ষা মোতাবেক বাংলাদেশে ধর্ষণের হার প্রতি লাখে ১০ জন এবং সমগ্র বিশ্বে আমাদের অবস্থান ৪০তম। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতে প্রতি লাখে ৮ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়, যা বাংলাদেশের তুলনায় কম।

এবার ভাবুন বাংলাদেশের অবস্থা কতটা ভয়াবহ। বিচারবিভাগের স্বজনপ্রীতি এর সমস্ত দায়ভার নিতে বাধ্য। এই বিচারের কার্যক্রম যেকোনো পর্যায়ের হোক না কেন। কয়েকদিন আগে দেখা গেছে ধর্ষণের বিচার হিসেবে কেবল ৭২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ব্যাপারটা অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন নারীর সম্মান এতই মূল্যহীন!

বাংলাদেশে এখন ধর্ষণের সমস্যাটা জৈবিক নয়; সামাজিক। সাধারণত মানুষ জৈবিক তাড়নায় ধর্ষণ করে। কিন্তু যখন ধর্ষণের পর ধর্ষক লাইভে এসে ধর্ষণের কথা জানান দেয় তখন আর সেটা জৈবিক তাড়না থেকে ধর্ষণ বলার উপায় থাকে না। ধর্ষক যেন প্রতিটি মা-বোনকে এই ম্যাসেজ দিতে চায় যে— পরবর্তী টার্গেট তুমি।

বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পায় না বা প্রকৃতপক্ষে প্রকাশ করা হয় না এবং তার কারণও সামাজিক। ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পেলে পুরুষের যতটা মর্যাদাহানি হয়, তার চেয়ে ঢের বেশি মর্যাদাহানি হয় ক্ষতিগ্রস্ত নারীর।

ধর্ষিত নারী ও শিশুর অধিকাংশেরই অবস্থান সামাজিকভাবে প্রান্তিক। মূলত ধর্ষণের প্রান্তিক পর্যায়ের খেটে খাওয়া পোশাককর্মী, নিম্ন আয়ের পেশাজীবী নারী, দরিদ্র স্বল্পশিক্ষিত ছাত্রী, গৃহবধূ এবং আদিবাসী নারী। পুলিশ স্টাফ কলেজের (২০১৮) গবেষণা অনুযায়ী, ধর্ষিত নারী ও শিশুদের ৭০.৯ শতাংশের মাসিক কোনো আয় নেই এবং ১৯.৪ শতাংশ নারী ও শিশুর মাসিক আয় ১০ হাজার টাকারও নিচে। এদের গড় মাসিক আয় মাত্র ২ হাজার ৮৪১ টাকা। যার কারণে এসব নারী ও শিশুর মামলা, বিচারিক প্রক্রিয়ায় সমান অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না, ন্যায়বিচারও তাঁরা পান না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারী ও শিশুদের বিপরীতে ধর্ষকদের অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা ভালো।

একই গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ধর্ষকদের সামাজিক অবস্থানের মধ্যে ১৪.৯ শতাংশ ধনিক শ্রেণির সন্তান, ৯.১ শতাংশ রাজনীতিবিদের সন্তান/আত্মীয় এবং ৪.৬ শতাংশ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী। এখানে প্রান্তিক ধর্ষিত নারী ও শিশুর সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও সামাজিকভাবে ক্ষমতাবান ধর্ষকদের সামাজিক বৈষম্যই ধর্ষণের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

এখন শেষ কথা হচ্ছে এত কিছু ঘটার পর শাস্তিই কি সমাধান?! কিন্তু আমার মতে এদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শাস্তিই শেষ সমাধান বলে মনে হয় না। শাস্তিটা দেওয়া যায় শিক্ষিত মানুষদের। কোনো জানোয়ারকে শাস্তি দিলে কোনো উপকার হবে না। যেমন লাগামহীন ছাগলকে প্রতিদিন শাস্তি দিলেন অন্যের ক্ষেতের ধান নষ্ট করার জন্য। কিন্তু পরেরদিন সে আবার ধান নষ্ট করল আপনি আবার শাস্তি দিলেন। এমন করে আর কতদিন।

এদেশের অবস্থা অনুযায়ী প্রথমে ধর্ষণের ব্যাধিটা সামাজিক সমস্যা থেকে জৈবিক সমস্যা অবনতি করতে হবে। যেমন ঐ সমস্ত শালিসের বিচারক আচ্ছা করে ধোলাই দেওয়া যারা কেবল ৭২ হাজার টাকায় একজন নারীর সম্মান বেঁচে দেয়। আর সবচেয়ে বড় কথা বিচারব্যবস্থা স্বজনপ্রীতি আর প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রভাব মুক্ত না করতে পারলে বিচার করবেন কার?!

যতক্ষণ পর্যন্ত ধর্ষণ সামাজিক সমস্যা থাকবে ততক্ষণ কোনো শাস্তিই ধর্ষণ ফিরিয়ে রাখতে সক্ষম না। বরং ধর্ষণের পর ধর্ষিতার কেউ ধর্ষকের বিরুদ্ধে যেন কোনো অভিযোগ করতে না পারে ধর্ষক সেই ব্যবস্থা করবে। সেটা যেকোনো উপায়েই হোক। মনে রাখবেন যে সকল দেশে শাস্তির জন্য ধর্ষণ প্রতিরোধ হচ্ছে সে সকল দেশে ধর্ষণ সামাজিক সমস্যা নয়; জৈবিক তাড়না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ সামাজিক সমস্যা। আর এর মদদদাতা ছোট্ট একটা গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি পর্যন্ত।

সম্পর্কিত সংবাদ

95,640FansLike
1,432FollowersFollow
2,458FollowersFollow
2,145SubscribersSubscribe

সর্বশেষ সংবাদ