মৌলভীবাজার ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সম্মেলন অনুষ্ঠিত

0
2

মৌলভীবাজার প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির ৫ম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সম্পাদক শ্রমিকনেতা প্রকাশ দত্ত সম্প্রতি পাস হওয়া বাংলাদেশ শ্রম(সংশোধন) আইন-২০১৮ এর শ্রমিক স্বার্থবিরোধী সকল কালাকানুন বাতিল করে আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ অনুযায়ী অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক শ্রমআইন প্রণয়নের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান।

শুক্রবার (০৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেল থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত মৌলভীবাজার পৌর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে তিনি আরও বলেন গত সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে নির্বাচিনী ডামাঢোলের মধ্যে শ্রমিকপক্ষের মতামতকে উপেক্ষা করে শ্রম(সংশোধন) আইন-২০১৮ পাস করা হয়।

সংশোধিত শ্রম আইনে কৌশলী শব্দ ব্যবহার করে শ্রমিকদের কর্মঘন্টা বাড়িয়ে ১০ ঘন্টা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বিভিন্ন রকম শর্ত বহাল রাখা, রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত মাতৃত্ব ছুটির অধিকারকে ‘অনুপস্থিপিত’ বলে অবিহিত করা, শ্রমিকদের মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ মাত্র ২ লাখ টাকা করা, বর্তমান আইনের ২৩ ও ২৬ ধারা বহাল রেখে মালিকদের স্বার্থরক্ষা করা হয়েছে।

জেলা ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি মোঃ নুরুল মোহাইমীনের সভাপতি অনুষ্ঠিত সম্মেলনের ১ম পর্বে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলনের উদ্বোধন করে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ এডভোকেট কুমার চন্দ্র রায়।

উদ্বোধনের পর বিভিন্ন শ্রেণি পেশার শত শত নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে লাল পতাকা ও ব্যানার ফেস্টুন সম্বলিত এক বর্ণাঢ্য র‌্যালী শহর পদক্ষিণ করে। পরে পৌর মিলনায়তনে সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে আয়োজিত আলোচনা সভায় উদ্বোধক এডভোকেট কুমার চন্দ্র রায় নিছক অর্থনীতিবাদী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের পরিবর্তে শ্রেণি চেতনাকে শানিত করে ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের নেতাকর্মীদের বিপ্লবীধারা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন বর্তমান বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়ে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। বিশ্বের মাত্র ২৬ জন ধনকুবের কাছে ৩৮০ কোটি(পৃথিবীর অর্ধেক) দরিদ্র জনগোষ্ঠির সম্পদ রয়েছে। ২০১৭ সালে ওই সংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্টির সম্পদ ৪৩ ধনকুবেরের কাছে ছিল। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬১ অর্থাৎ শীর্ষ ধনীদের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার হার দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। এর বিপরীতে কমছে দরিদ্রদের সম্পদ। গতবছর বিশ্বের ২,২০০ জন ধনবানের সম্পদ মোট বেড়েছে ৯০ হাজার কোটি ডলার, যাদের প্রতিদিন গড়ে সম্পদ বেড়েছে ২৫০ কোটি ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় ২১,২৫০ কোটি টাকার সমান।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশেও শ্রমিক কৃষক জনগণের শ্রমে-ঘামে যে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয় তার সিংহভাগই লুটপাট করে নেয় সাম্রাজ্যবাদ ও তার এদেশীয় দালাল জোতদার-মহাজন, দুর্নীতিবাজ আমলারা। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাদের শীর্ষ নেতারাই এই লুটপাটের সাথে জড়িত থাকে। এই লুটপাট মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের টাকা লোপাট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে খেলাপী ঋণের পরিমাণ।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক তথ্যে উঠে আসে গত ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, যার মধ্যে শুধু ২০১৫ সালেই ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। অপর এক তথ্যে প্রকাশিত হয় অতি ধনী বেড়ে যাওয়ার হারে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। ‘অতি ধনী’ বলতে যাদের সম্পত্তি ৩ কোটি ডলার বা ২৫০ কোটি টাকার বেশি তাদের বুঝিয়েছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত আগের ৫ বছরে বাংলাদেশে অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৭.৩%।

অপর দিকে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষ রয়েছে এমন দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৫ম। যাদের দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্ট(প্রায় ১৬০ টাকা) তাদেরকে ‘হতদরিদ্র’ বলা হয়ে থাকে। এই হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ২ কোটি ৪১ লাখ নাগরিকের আয় এর চেয়ে কম। যদিও প্রকৃত অবস্থা আরও ভয়াবহ। ইতিমধ্যে সরকারি হিসেবে বাংলাদেশকে ‘নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ‘নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ’ হিসেবে ‘দারিদ্রসীমার’ ওপরে উঠতে হলে দৈনিক তিন ডলারের(প্রায় ২৫৫ টাকা) বেশি আয় করতে হবে, সেই হিসেব ধরলে বাংলাদেশে দরিদ্রের সংখ্যা ৮ কোটি ৬২ লাখ। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশে ধনী ও গরিবের ব্যবধান দ্রুততার সঙ্গে ব্যাপকভাবে বাড়ছে, যার কারণে জনগণের ব্যাপক অংশের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ। বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে যার প্রকাশ ঘটছে।

সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন এনডিএফ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি কবি শহীদ সাগ্নিক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সিলেট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ ছাদেক মিয়া, বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আহবায়ক ডা. অবনী শর্ম্মা, স’মিল শ্রমিক সংঘ সিলেট বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন, হবিগঞ্জ জেলা হোটেল রেস্টুরেন্ট মিস্টি বেকারি শ্রমিক ইউনিয়ন রেজিঃ নং চট্টঃ২৮৬৮ এর সভাপতি মোঃ কাওছার খান।

সম্মেলনের ২য় পর্বে সাংগঠনিক অধিবেশনে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রজত বিশ্বাস সম্পাদকীয় রিপোর্ট পেশ করেন। রিপোর্টের উপর আলোচনা করেন মৌলভীবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন রেজিঃ নং চট্টঃ-২৩০৫ এর সভাপতি মোঃ মোস্তফা কামাল, মৌলভীবাজার জেলা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন রেজিঃ নং চট্টঃ ২৪৫৩ এর সাধারণ সম্পাদক মোঃ দুলাল মিয়া ও চা-শ্রমিক সংঘের নেতা প্রবীণ চা-শ্রমিকনেতা স্যামুয়েল বেগম্যান প্রমূখ। সম্মেলনে মোঃ নুরুল মোহাইমীনকে সভাপতি ও রজত বিশ্বাসকে সাধারণ সম্পাদক পুণঃনির্বাচিত করে ২১ সদস্য বিশিষ্ট জেলা কমিটি গঠন করা। নব-নির্বাচিত কমিটি শপথ বাক্য পাঠ করান প্রধান অতিথি প্রকাশ দত্ত।

সম্মেলন থেকে বর্তমান বাজারদেরে সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ন্যায্য মূল মজুরি ২০ হাজার টাকা ঘোষণা, গণতান্ত্রিক শ্রমআইন প্রণয়ন ও অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, মাসিক বেতনের সমপরিমান উৎসব বোনাস প্রদান, চা-শিল্পে শ্রমআইনের বৈষম্য নিরসন ও বাঁচার মতো মজুরি নিশ্চিত করা, হোটেল, প্রেস, দর্জি, রাইছ মিল, স’মিলসহ বিভিন্ন সেক্টরে ৮ ঘন্টা কর্মদিবসসহ শ্রমআইন বাস্তবায়ন ও সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি কার্যকর, সমকাজে সমমজুরি ও কর্মক্ষেত্রে সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান করার দাবি জানানো হয়।