সাতছড়ি উদ্যানে ফুটেছে ফুল, অবাধে ঘুরছে বন্যপ্রাণী

সাতছড়ি উদ্যানে ফুটেছে ফুল, অবাধে ঘুরছে বন্যপ্রাণী

গিরি ধন সরকারঃ সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। প্রায় ২৪৩ হেক্টর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠা এ উদ্যান পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। প্রতিবছর ভ্রমণ পিয়াসুরা ভিড় করেন সাতছড়ির বিস্তৃত উদ্যানে; পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়ান বনের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। মিশে যান সবুজে; প্রাণজুড়িয়ে দেখেন নানান প্রজাতির বন্যপ্রাণী।

তবে করোনাভাইরাসে কারণে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্পটের মতো সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানেও পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেই নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘ দুই মাস থেকে সাতছড়ি রয়েছেন পর্যটন শূন্য। ঈদেরও পুরো পর্যটক শূন্য ছিলো বিশাল বিস্তৃত সবুজ সমোরহ সাতছড়ি।

অথচ গত ঈদে সাতছড়িতে ছিলো লোকে লোকারণ্য। এর ফলেই গত ঈদে ৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৯০ টাকার রাজস্ব আদায় করেছিল হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষ। অথচ এবার রাজস্ব শূন্য। তবে সরকার রাজস্ব শূন্য হলেও নীরব, নিস্তব্ধ সাতছড়ি নতুন রূপে সেজেছে। মানুষের কোলাহল-মুক্ত সাতছড়ি যেন নিজস্ব রূপ নিয়ে নবরূপে হাজির হয়েছে। উদ্যোগের বাহারি গাছগুলোতে ফুল এসেছে। মনের আনন্দে উদ্যানের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্য প্রাণী। এ-যেনো নতুন এক সাতছড়ি।

কারণ সাতছড়ির জাতীয় উদ্যানের প্রায় ১৪৫ প্রজাতির নানা জাতের গাছপালা নতুন রূপ ধারণ করেছে। এছাড়া দেখা মিলছে মেছো-বাঘ, উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, শুকুর, লজ্জাবতী বানর, চশমা হনুমান এবং নানা প্রজাতির সাপ। থেমে নেই পাখির কোলাহলও। লাল মাথা ট্রগন, ধনেশ, ঘুঘু, টিয়া, ঈগল, ময়না ইত্যাদি পাখির বিচরণ পুরো উদ্যান-জুড়ে।

তোফাজ্জল হোসেন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, ‘অন্য সময় সাতছড়ি উদ্যানের ভেতরে সব সময় পর্যটক থাকত। তাদের হইহোল্লোরে বন্যপ্রাণীরা বনের ভেতরে লুকিয়ে থাকত। কিন্তু এখন বানর, উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, ময়না, টিয়া, বনমোরগ ও সাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু ও পাখি সব সময় সামনে এসে ঘুরাঘুরি করছে। এছাড়া মায়া হরিণ, মেছো-ভাগসহ বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তুরও প্রায় সময় দেখা মিলছে।’

আর বনপ্রহরী মো. রমিজ আলী বলেন, ‘আমরা বললে অনেকে বিশ্বাস করবেন না। এই উদ্যানে মায়া হরিণসহ বিভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে। যাদের দেখা এখন মিলছে। লকডাউনে উদ্যানের ভেতরে পর্যটক না আসায় তারা গহীন অরণ্য থেকে বেরিয়ে এসে সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

তবে সরেজমিনে উদ্যানটি ঘুরে দেখা যায়, পরিচর্যার অভাবে উদ্যানের সমুখে ময়লা আবর্জনা জমেছে। যেন উদ্যানটি দেখার জন্য কেউ নেই। তবে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন বলছেন, ‘বিভিন্ন গাছের পাতা পড়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন পরিষ্কার করলে আবারও ময়লা হবে। তাই আমরা লকডাউন উঠার পর উদ্যানটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই পর্যটক আসুক। কিন্তু তাদের কারণে যেন বন্যপ্রাণীদের কোন সমস্যা না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। আমরা সব সময় পর্যটকদের বেশি হইহুল্লোর করতে দেই না। কিন্তু এতে অনেক পর্যটক রাগ হন আমাদের প্রতি।’

এ রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘লকডাউনের কারণে উদ্যানটি দুই মাস ধরে বন্ধ থাকায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্য বছর ঈদে পর্যটকদের ঢল নামত উদ্যানে। কিন্তু এবছর একজন পর্যটকও আসছেন না। আর আসলেও আমরা তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছি।’

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে প্রায় ২৪৩ হেক্টর জায়গা নিয়ে সিলেট বিভাগের প্রবেশ পথ হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় রঘুনন্দন পাহাড়ে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠা সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে অবস্থিত সাতটি পাহাড়ি ছড়া বা ঝর্ণা থেকে এই স্থানের নামকরণ করা হয় সাতছড়ি। পূর্বে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান (Satchari National Park) ‘রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্ট’ নামে পরিচিত ছিল।