একজন উদ্যোগী উপজেলা শিক্ষা অফিসার এর গল্প

Siddiqur Rahman
ছিদ্দিকুর রহমান, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, মাধবপুর,হবিগঞ্জ

আজ আপনাদেরকে একজন উদ্যোগী উপজেলা শিক্ষা অফিসার এর গল্প বলব। উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন উপজেলা শিক্ষা অফিসারগণ।  শিক্ষা কর্মকর্তার যোগ্য নেতৃত্বের বদৌলতে যেমন উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষার ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয় আবার তাঁর দুর্বল নেতৃত্বের কারণে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা স্তিমিত হয়ে পড়ে।  উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষার হালচালই প্রকৃতপক্ষে জানান দেয় সেই উপজেলার  শিক্ষা অফিসার এর কর্মদক্ষতা। অনেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার আছেন  যারা মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে রুটিন কাজের পাশাপাশি বিভিন্নমুখী উদ্যোগী কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকেন। তেমনি একজন ইতিবাচক উপজেলা শিক্ষা অফিসার ছিদ্দিকুর রহমান।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনার শেষে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর এক পর্যায়ে যোগদান করেন বর্তমান পদে। 

উপজেলা শিক্ষা অফিসার এর প্রথম কর্মস্থল বরগুনা জেলার বামনা উপজেলায় প্রায় দুই বছর এবং ২য় কর্মস্থল হিসেবে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিন বছর একজন সৎ ও প্রাথমিক শিক্ষা নিবেদিত কর্মী হিসেবে সর্ব মহলের সুনাম অর্জন করেন। র্কমদক্ষতার স্বীকৃতি ও পেয়েছেন। সমাপনী পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের জন্য পেয়েছেন বরিশাল বিভাগের সেরা উপজেলা শিক্ষা অফিসার এর পুরস্কার। ইংলিশ ইন- একশন, “কিশোরগঞ্জ মডেল” এর নির্মাতা হিসেবে নিজ বিভাগ ও ইংলিশ-ইন এ্যাকশন কর্তৃক একাধিকবার স্বীকৃতি পেয়েছেন। শ্রেণিপাঠদান ছাড়াও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন  প্রতিযোগিতায়  ইংলিশ ইন-এ্যাকশন এর একশন গানগুলো সবাই কে মুগ্ধ করছে।

মাধবপুর উপজেলার যোগদানের দুই মাসের মধ্যেই  সকল বিদ্যালয়ে লোকেশন র্বোড- দিক নির্দেশক সাইনবোর্ড স্থাপন করে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যা পরবর্তীতে বিভাগীয় দপ্তর এর নির্দেশনায় সকল জেলা ও উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।

শেষ কো-হর্টের কার্যক্রম হলেও শিক্ষা অফিসার তার নিজস্ব উদ্যোগে সকল বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য ইংলিশ ইন এ্যাকশনের মেমোরী কার্ড (এস.ডি কার্ড) ও টিচারস গাইড বিনামূল্যে প্রদানের ব্যবস্থা করেন এবং প্রতি বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষকদের নিয়ে ওরিয়েন্টেশন এর আয়োজন করেন। ফলে বিদ্যালয়ের দৈনিক সমাবেশসহ শ্রেণি কার্যক্রমে ইংলিশ ইন এ্যাকশনের এ্যকশন পরিলক্ষিত হচ্ছে।

শিশুদের পড়ার দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের মে মাস থেকে এসো পড়তে শিখিশিরোনামে ইনোভেশন প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে আসছেন। এত করে দুর্বল শিশু সনাক্ত হচ্ছে এবং শিশুর দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন কার্যক্রম যেমন শিক্ষকভিত্তিক দুর্বল শিক্ষার্থী বন্টন, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিবিড় তত্বাবধান, শিক্ষা অফিস কর্তৃক নিয়মিত ফলোআপ-পরিচালনায় শিশুর পড়া দক্ষতার অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে।

২০১৬ সালের জুলাই মাসে গ্রহণ করেন, শতভাগ বিদ্যালয়ে মিডডে মিল বাস্তবায়ন প্রকল্প। উপজেলা পরিষদের সহযোগিতায় সকল বিদ্যায়ের হত দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিতরণ করেন টিফিন বক্স। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকগণ একই কক্ষে বসে দুপুরের খাবার খায়। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে ঐ বছর সেপ্টেম্বর মাসেই শতভাগ বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল বাস্তবায়ন করেন। মিড-ডে মিল ধারণটি বর্তমানে জাতীয়ভাবে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মস্ত্রনালয়ের মন্ত্রীর নেতৃত্বে সারাদেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে।   

এগিয়ে  যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ  এবং  আপনার উদ্ধাবনী ধারণাশিক্ষায় আনবে সম্ভাবনা– এই স্লোগান দুটোকে ধারণ করে মাধবপুর উপজেলা ২০১৭ সাল ইনোভেশন এর ছড়াছড়ি। সবার জন্য মান সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করণে নেয়া হয়েছে- ক্লাস পার্টি, স্থানীয় উদ্যোগে ৪০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৃথক শ্রেণি কক্ষ নির্মাণ প্রজেক্টশ্রেণি শিক্ষকদের নিজ শ্রেণির প্রতি অধিক মালিকানাবোধ জাগ্রত করণে শ্রেণি আমারশিশু আমারআইডিয়া উদ্ভাবন, বাতায়ন ৫৬আলো আসবেই ইত্যাদি কার্যক্রম সফলতার সাথে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তাছাড়া মেন্টর হিসেবেও শিক্ষা অফিসার ছিলেন সফল। তার প্রেরণায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান ও সহকারী শিক্ষকগণ ইনোভেশন প্রজেক্ট যেমনকর্মবীর, এসো গড়ি স্বপ্নের স্কুল, ক্লাসরুম দেয়ালিকা, সাথী, এসো শিখি একসাথে, মেটারিয়াল টুলকিটস ইত্যাদি ইনোভেশন কার্যক্রম  উদ্ধাবন ও বাস্তবায়ন করছেন।

ইনোভেশন কার্যক্রমের যথার্থ স্বীকৃতি ও পেয়েছেন তিনি। শিক্ষা অফিসার এর উদ্ধাবিত “ক্লাস পার্টি” ইনোভেশন প্রজেক্ট টি জাতীয় পর্যায়ের ২য় সেরা ইনোভেশন হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে এবং তাঁরই শিক্ষক জনাব ফখরউদ্দিন মোবারাক শাহ উদ্ভাবিত কর্মবীর ধারণাটি সেরা ১৫ টি রেপ্লিকেটযোগ্য ইনোভেশন এর মধ্যে অন্যতম ইনোভেশন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে সকল বিদ্যালয়ে অভিযোগ ও পরামর্শ বক্স স্থাপন, লস্ট এন্ড ফাইন্ড বক্স এর কার্যকর ব্যবহার, কার্যকর সততার স্টোর, দৈনিক সমাবেশে মটিভেশনাল বক্তব্য প্রদান, সু-সজ্জিত ও সুপরিসর বাগান এবং সর্বপরি পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয় তিনি নিশ্চিত করেছেন। ফল স্বরূপ ২০১৮ সালে সিলেট বিভাগের উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা ক্যাটাগরিতে সেরা শুদ্ধাচার অফিসার হিসেবে ভূষিত হয়েছেন।

শিক্ষা অফিসার বর্তমান কর্মস্থলে যোগদানের পর পরই শিক্ষকদের আইসিটিতে সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে গ্রহণ করেছেন অভিনব সব উদ্যোগ। আইসিটিতে দক্ষ ও অভিজ্ঞদের নিয়ে গড়েছেন আইসিটি সেল। প্রায় প্রতি মাসেই আইসিটি সংক্রান্ত বিশেষ সভা ও কর্মশালা করেছেন। ফলে উপবৃত্তিসহ ই-প্রাইমারি স্কুল সিস্টেম, ই-ব্যবস্থাপনা, অনলাইন সেবা ও আবেদন পত্র প্রেরণ সহ বিদ্যালয়ের যাবতীয় আইসিটি সংক্রান্ত কাজ শিক্ষক এখন নিজেই করতে সক্ষম ।

ই-নথির মাধ্যমে সকল আবেদন নিষ্পত্তির ফলে শিক্ষকগণ টিসিভি তে অনেক লাভবান হয়েছেন। ফলে তাঁরা অধিক সময় বিদ্যালয়ে পাঠদানে মনোযোগী হতে পারছেন। নিশ্চিত হয়েছে সকল ধরণের হয়রানি ও দুর্নীতি মুক্ত উপজেলা শিক্ষা অফিস, যা মান সম্মত শিক্ষার অন্যতম নিয়ামক।

তাছাড়া নবনিযুক্ত ও যোগদানকৃত শিক্ষকদের ওরিয়েন্টশন কর্মশালা, শিক্ষকদের ভাল কাজের স্বীকৃতি প্রদান, উপজেলার হিসাব রক্ষণ অফিস থেকে শিক্ষকদের সকল জিপিএফ স্লিপ একত্রে সংগ্রহ ও বিতরণ, ১২ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৮ম শ্রেণিতে উন্নিতকরণ সহ বিভিন্ন উদ্যোগী কর্মসূচী শিক্ষা অফিসার কর্তৃক গ্রহণ করা হয়েছে।

উন্নয়নের বাতিঘরপ্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে উপজেলা শিক্ষা অফিসার ছিদ্দিকুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্খিত মান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।