হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় শিল্পায়নের বিস্তারে কমছে কৃষিজমি। কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে উঠছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক বহুতল ভবন ও শিল্পকারখানা। বিশেষ করে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের নতুন হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক-২ স্থাপনের পর স্থানীয়ভাবে কৃষিজমি হারানো, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভা ও ইউনিয়ন এলাকার বড়চর মৌজায় প্রায় ৪০ একর জমি নিয়ে ২০২৪ সালে দ্বিতীয় শিল্প পার্ক গড়ে তোলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে ওপাল গ্লাসওয়্যার ও কর্কশিট উৎপাদনের জন্য তিনটি প্রধান ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন কারখানা ও ভবন নির্মাণের কাজও চলছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান চৌধুরী কামাল জানান, বিদ্যমান পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, নতুন পণ্য বাজারজাতকরণ এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর লক্ষ্যে উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বড়চর মৌজায় দ্বিতীয় শিল্প পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। এ প্রকল্পে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে শিল্প পার্কের আশপাশের জমি কেনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সুপারভাইজার শামসুল আলম সোহেল জানান, উপজেলার অলিপুর এলাকায় অবস্থিত প্রথম শিল্প পার্কের পর বড়চর মৌজায় দ্বিতীয় শিল্প পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এ প্রকল্পের অর্থায়নে নিজস্ব মূলধন ও ঋণ ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অলিপুর এলাকায় প্রায় ৩০০ একর জমি নিয়ে প্রথম শিল্প পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেখানে একাধিক কারখানা গড়ে ওঠে। বর্তমানে ওই শিল্প পার্কে প্রায় ২৫ হাজার নারী-পুরুষ কাজ করছেন।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় শিল্প পার্কে শুরুতে প্রায় ৫০০ শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হলেও বর্তমানে সেখানে এক হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ওপাল গ্লাসওয়্যার উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য সেখানে আরও কয়েকটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে ওপাল গ্লাসওয়্যারের বার্ষিক বাজারের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং এ বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ১১টি শিল্প পার্ক ও ২১টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ধরনের পণ্য উৎপাদিত হয় বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে শিল্পায়নের ফলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও কৃষিজমি কমে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কৃষিজমি ক্রমাগত শিল্প ও আবাসন খাতে রূপান্তরিত হলে স্থানীয় কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
এ ছাড়া শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ু ও পানির মান এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ যথাযথভাবে নিশ্চিত করা না হলে আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এ এলাকায় শিল্পকারখানার কারণে নির্দিষ্ট রোগের প্রকোপ বেড়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত এবং বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় শায়েস্তাগঞ্জে শিল্পায়নের পাশাপাশি অবশিষ্ট কৃষিজমি সংরক্ষণ, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, নিয়মিত দূষণ পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি গুরুত্ব পাচ্ছে।






