মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক:
ভারতীয় উপমহাদেশের খ্যাতিমান প্রাণপুরুষ অগণীত জনতার হৃদয় রাজ্যের যিনি মুকুটহীন সম্রাট শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ:) এক জীবন্ত ইতিহাস, গেীরবের কিংবদন্তি। সত্য-ন্যায় এবং আহলে সুন্নাতওয়াল জামাতের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন, পাশাপাশি জ্ঞানের আলো বিতরণে নিরলস চেষ্টা করেছেন। ইসলাহে নফসের জন্য তিনি যেমন আজীবন চেষ্টা সাধনা করেছেন তেমনি গুরুত্বের সাথে ইসলাহে কওম ও হুকুমতের জন্যও চালিয়েছেন বিরামহীন জেদ্দ-জেহাদ।
আল্লামা ফুলতলী (রহ:) আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তায় ও বিশ্বাসে অনিন্দ্য সুন্দর উপাসনা আর বলিষ্ঠ ও প্রখর ব্যক্তিত্বের গুণাবলী সবার মাঝে ছড়িয়ে আছে। তাঁর জীবনের বিভিন্ন গুণাবলি আমাদেরকে সঠিক পথ চলতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তিনি উপযুক্ত কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছেন, সংগঠন কায়িম করেছেন, দুর্বার আন্দোলন সৃষ্টি করেছেন, বিভিন্ন দেশে ও মহাদেশে তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। সর্বত্র সেসব সংগঠনের শতশত শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী চলছে সত্যিকার দ্বীন কায়িমের সুমহান খিদমত। তিনি ছিলেন একজন যুগ শ্রেষ্ঠ খ্যাতিমান আলেম। তাঁর আপাদমস্তক ছিল রাসুল (সা:)-এর আদর্শে উদ্ভাসিত। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী প্রত্যেক নির্যাতিত, নিপীড়িত, অবহেলিত এবং মজলুম অনাথ মানুষের পক্ষে সু-উচ্চ কন্ঠস্বর। তিনি ছিলেন জালিম ও রাসুল (সা:)-এর শক্রদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিশেষ করে তাগুতের বিরুদ্ধে তাঁর সময়োপযোগী এবং সাহসী কন্ঠ ছিল ধারালো তরবারির চেয়েও কঠোর। রাসুল (সা:)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত এ মহান ব্যক্তির মাঝে ছিল প্রেম, প্রীতি, স্নেহের ও ভালোবাসার মধুর সুর, অনাচার নির্যাতনের এবং সকল বাতিলের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন বিদ্রোহের প্রতীক। তিনি কখনো ছিলেন কোমল আবার কখনো কঠোর এক প্রাচীর।
সত্যিই নানা বিস্ময়কর ও বৈচিত্রে ভরপুর আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এর জীবনালেখ্য। আমরা যেমন তাঁকে দেখতে পাই বিজন পার্বত্য-অরণ্যে গভীর ধ্যানমগ্ন সাধক রূপে, তেমনি দেখতে পাই আল্লাহ তায়ালার দ্বীন কায়েম এবং রাসুল (সা:)-এর আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও সংগ্রামের ময়দানে অকুতোভয় মুজাহিদ, অগ্রপথিক বীর সিপাহসালার রূপে। ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এর চরিত্র আচার-আচরণ ও ব্যবহার ছিল নম্রতা ও ভদ্রতায় পরিপূর্ণ। জীবনের ঊষালগ্ন থেকে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম জাতির ক্রান্তিকালের উত্তরণে চিন্তা মাথায় নিয়ে যারা সামনে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে দীপ্ত কঠিন শপথে আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এর অভিযাত্রা অন্যতম। তিনি কোরআন ও হাদিসকে সামনে রেখে বাতিলের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠে বীরদর্পে সামনে এগিয়ে যান। কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস’সহ ধর্মীয় প্রত্যেক কিতাবের মর্মবাণী উপলব্ধিকরে সফলতা ও কৃতিত্বের সাথে উপস্থাপন করে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষাবিদেও মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ঈমান আক্বিদা রক্ষার আন্দোলনে তাকে পাওয়া যেত অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো।
বাংলার আধ্যাত্নিক রাজধানী নামে পরিচিত সিলেটের মুকুটহীন সম্রাট শাহজালাল ইয়ামনি (রহ:)-এর ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম শাহ কামালের নয়নের মধ্যমণি আল্লামা ফুলতলী (রহ:) ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল, অবিচল, নিরহংকার, খোদাভীরু, শান্তিপ্রিয় রাসুল প্রেমিক। সামাজি, রাজনৈতি ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম, হিন্দু, বৌব্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যকার শান্তি সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। ইসলামি চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে তিনি সু-লেখক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, মিষ্টভাষি সুবক্তা, আহলে সুন্নাত ওয়লা জামাতের বীর সিপাসালার আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এর অন্যতম চিন্তার চেতনার হাতিয়ার আনোয়ারুস সালিকিন অথবা নালায়ে কলন্দর নামে কাব্যগ্রন্থ দু‘টি বরেণ্য কবিদের চেয়ে কম নয়? এছাড়া পবিত্র আল-কোরআন সহিহ শুদ্ধভাবে তিলাওয়াতের জন্য তাঁর অন্যতম একটি রচনা হলো “আল-কাউলুছ ছাদীদ”।
সকল অপশক্তির হাত থেকে সাধারণ মুসলমানদের ঈমান-আমল রক্ষা করার জন্য তিনি বৃদ্ধ বয়সে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণে আল্লামা ফুলতলী (রহ:) কে ভাবিয়ে তুলেছিল। তাই তিনি প্রত্যেকের কল্যাণের জন্য নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত হাজারও এতিম-অনাথদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল লতিফিয়া এতিমখানা, বাদে দেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসা, সোহানীঘাট কামিল মাদরাসা, বৃদ্ধানিবাস প্রকল্প, ফ্রি ডিসপেনসারী, লতিফিয়া শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট, শিক্ষক সংগঠন জমিয়তুল মোদারিছীন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পবিত্র আল-কোরআন বিশুদ্ধভাবে পড়ার সাড়া জাগানো “দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট” তাঁর শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যিনি তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময় ব্যয় করে গেছেন পবিত্র কোরআনের খেদমতে, যিনি তাঁর সম্পদের এক বিশাল অংশ (৩৩ একর জমি) দান করে গেছেন দারুল কিরাতের নামে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স, স্কটল্যান্ড এবং পার্শ্ববর্তী ভারতের মতো বিভিন্ন বিধর্মী ও খ্রিষ্টানপ্রধান দেশগুলোর মধ্যেও গড়ে তুলেছেন, অসংখ্য-অগণিত মসজিদ, মাদরাসা, পৌঁছে দিয়েছেন ইসলামের সুমহান বাণী এবং সহি আকিদা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান যুগ যুগ ধরে মুসলিম হৃদয়ে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
আল্লামা ফুলতলী (রহ:) এখন আর কোনো সাধারণ নাম নয়! একটি সংকল্পের, একটি আদর্শের, একটি সংগ্রামের, একটি লক্ষের, একটি সোনালী ইতিহাসের নাম। মুসলিম ইতিহাসে আল্লামা ফুলতলী (রহ:) নামটি থাকবে চির-অমর, অক্ষত-অম্লান। তিনি তাঁর অবস্থানে এক ও অদ্বিতীয়, অতুলনীয়, অনন্য, অসাধারণ। আমার স্বপ্নের কল্পনার ও শ্রদ্ধায়, আমার আস্থা ও ভালোবাসার প্রতিক আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এ পৃথিবীতে একবারই এসেছিলেন, আর দ্বিতীয় কোন আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এই জমিনে ফিরে আসবেন না। তবে আল্লামা ফুলতলী (রহ:) আজ দুনিয়ায় নেই বলে, তার সুমহান আদর্শ, অপরিণামদর্শী ত্যাগ-তিতিক্ষার, কোনকিছুই তিল পরিমাণও ক্ষয় হয়নি। বরং তাঁর ইন্তেকালের পর থেকে দেখা যাচ্ছে যে, জীবিত আল্লামা ফুলতলী (রহ:) চেয়ে ওফাত আল্লামা ফুলতলী (রহ:) বেশী ক্ষমতাসম্পন্ন!


