মাথার চুল ন্যাড়া করার বিষয়ে ইসলামী শরিয়ত এর বিধান : আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

ইসলামী শরিয়তে মাথার চুল মুণ্ডণ বা মাথা ন্যাড়া করা কখনো বৈধ, কখনো হারাম আর কখনো মাকরূহ (অপছন্দনীয়)। নিম্নে সংক্ষেপে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হল:

◈◈ ক. যখন মাথার চুল মুণ্ডণ করা বৈধ:

◍ হজ্জ ও ওমরায় পুরুষদের মাথার চুল মুণ্ডন করা বা ছোট করা ইবাদতের অংশ এবং আল্লাহর রহমতপ্রাপ্তির কারণ। যেমন: হাদিসে এসেছে,
أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ، قَالَ حَلَقَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَحَلَقَ طَائِفَةٌ مِنْ أَصْحَابِهِ وَقَصَّرَ بَعْضُهُمْ ‏.‏ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ رَحِمَ اللَّهُ الْمُحَلِّقِينَ – مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ قَالَ – وَالْمُقَصِّرِينَ ‏”‏ ‏.

‘আবদুল্লাহ (ইবনে ‘উমার) রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাথা মুণ্ডন করলেন। তাঁর কিছু সংখ্যক সাহাবীও মাথা মুণ্ডন করলেন আর কিছু সংখ্যক চুল খাটো করলেন।
আবদুল্লাহ রা. বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক অথবা দু বার বললেনঃ “যারা মাথা মুণ্ডন করেছে, আল্লাহ তাদের উপর রহম করুন।”

অতঃপর তিনি বললেনঃ “যারা চুল খাটো করেছে, তাদের উপরও।” (সহিহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ্জ, অনুচ্ছেদ: চুল ছাঁটার চেয়ে কামানো উত্তম এবং ছাঁটাও জায়িয, হা/৩০৩৫)

◍ অনুরূপভাবে নবজাতক সন্তানের সপ্তম দিনে এবং নব মুসলিমের ইসলাম কবুলের পর মাথার চুল মুণ্ডন করার ব্যাপারে শরিয়তের নির্দেশনা এসেছে।
عن علي بن أبي طالب رضي الله عنه قال : عق رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الحسن بشاة ، وقال : ( يا فاطمة احلقي رأسه وتصدقي بزنة شعره فضة ) حسنه الألباني في صحيح الترمذي (1226) ، وانظر : تحفة المودود لابن القيم (ص : 217)

أن النبي صلى الله عليه وسلم أمر رجلاً كافراً أسلم بقوله : ( ألق عنك شعر الكفر واختتن ) حسنه الألباني في صحيح أبي داود
◍ তাছাড়া বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন বোধে মাথার চুল মুণ্ডন করা জায়েজ। যেমন: কোন কারণে মাথার চুল কাটা সহজলভ্য না হওয়া, মাথার চিকিৎসা, উকুন নিধন ইত্যাদি। এ সব ক্ষেত্রে মাথার চুল মুণ্ডণে আলেমদের কোন দ্বিমত নেই।

◈◈ খ. যখন মাথার চুল মুণ্ডণ করা হারাম:

◍ রোগ-ব্যাধির সংক্রমণ ও বিপদাপদ অথবা কারো মৃত্যুতে শোক পালন ইত্যাদি উদ্দেশ্যে মাথার চুল মুণ্ডন করা হারাম।
হাদিসে এসেছে,
আবু বুরদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: (তাঁর পিতা) আবু মুসা আশআরী (রাঃ) যন্ত্রণায় কাতর হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। আর (ঐ সময়) তাঁর মাথা তাঁর এক স্ত্রীর কোলে রাখা ছিল এবং সে চিৎকার ক’রে কান্না করতে লাগল। তিনি (অজ্ঞান থাকার কারণে) তাকে বাধা দিতে পারলেন না। সুতরাং যখন তিনি চেতনা ফিরে পেলেন, তখন বলে উঠলেন,
أَنَا بَرِيءٌ مِمَّنْ بَرِىءَ مِنْهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم بَرِيءٌ مِنَ الصَّالِقَةِ وَالحَالِقَةِ وَالشَّاقَّةِ
“আমি সেই মহিলা থেকে সম্পর্ক মুক্ত, যে মহিলা থেকে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কমুক্ত হয়েছেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই মহিলা থেকে সম্পর্কমুক্ত হয়েছেন, যে মৃত্যুশোকে উচ্চ স্বরে মাতম করে, মাথা মুণ্ডন করে এবং কাপড় ছিঁড়ে ফেলে।” (বুখারী ১২৯৬, মুসলিম ২৯৮)

◍ ‘মাথার চুল মুন্ডন করলে করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকা যাবে’ এই বিশ্বাস সম্পূর্ণ কুসংস্কার, অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক। সুতরাং এই নিয়তে মাথা মুন্ডন করাও হারাম।

◍ অনুরূপভাবে রোগ-ব্যাধির কারণে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া মহিলাদের চুল মুণ্ডন করা হারাম। এমন কি হজ্জ-উমরার সময়ও মহিলাদের মাথার চুল মুণ্ডণ করা জায়েজ নেই। বরং তারা আঙ্গুলের মাথা বরাবর চুল কাটবে। কারণ লম্বা চুল নারীর স্বভাবজাত সৌন্দর্য্য।
সুতরাং তারা মাথার চুল মুণ্ডণ করবে না বরং চুল লম্বা করবে ও চুলের পরিচর্যা করবে-এটাই শরিয়ত সম্মত কথা ও সৃষ্টিগতভাবে নারী স্বভাবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

◍ একইভাবে কাফের-মুশরিক নায়ক, খেলোয়াড়, বক্সার, মডেল ইত্যাদির অনুকরণে মাথার চুল মুণ্ডন করা বা চুল কাটা হারাম। কেননা এতে অমুসলিমদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা হয়-যা ইসলামে নিষিদ্ধ।

◈◈ গ. বিনা প্রয়োজনে বা নিজস্ব অভিরুচি অনুযায়ী মাথার চুল মুণ্ডণ করা যাবে কি না তা কিছুটা দ্বিমতপূর্ণ:

বিনা প্রয়োজনে নিজের অভিরুচি অনুযায়ী মাথার চুল মুণ্ডন করা যাবে কিনা সে ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কিছুটা দ্বিমত রয়েছে। কেউ নিশর্তভাবে জায়েজ বলেন আর কেউ অপছন্দ করেছেন। (যেমন: ইমাম মালেক রহ.)। তাঁর অ পছন্দনীয় হওয়ার কারণ হল, মাথার চুল মুণ্ডন করাকে হাদিসে খাওয়ারেজদের আলামত বলা হয়েছে। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিমে এসেছে: سيماهم التحليق “আর তাদের বৈশিষ্ট্য হবে মাথা নেড়ে হওয়া।”

তবে জায়েজের পক্ষে নিম্নোক্ত দলিল সমূহ পাওয়া যায়। যেমন:

■ হাদিসে এসেছে:
أن النبي صلى الله عليه وسلم أتى آل جعفر بن أبي طالب رضي الله عنه ، بعد موت جعفر بثلاث ، ودعى بالحلاق فأمره أن يحلق رؤوس بنيه . صححه الألباني في صحيح أبي داود (3532)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাফর বিন আবু তালিব রা. এর মৃত্যু বরণের তিন দিন পর তার পরিবারের নিকট এসে নাপিত ডাকা হলে তার সন্তানদের মাথার চুল ফেলে দিতে বললেন। (সহিহ আবু দাউদ, হা/৩৫৩২-শাইখ আলবানি)
■ অন্য হাদিসে এসেছে:
بما رواه أبو داود (4195) أن النبي صلى الله عليه وسلم رأي طفلاً قد حُلِق بعض رأسه ، وتُرِك بعضه فقال : ( احلقوه كله أو اتركه كله ) صححه الألباني في صحيح أبي داود (3535)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন এম শিশুর মাথার কিছু অংশ মুণ্ডন করা হয়েছে আর কিছু অংশ করা হয় নি। তখন তিনি বললেন, হয় তার পুরো মাথা মুণ্ডন করো অথবা সম্পূর্ণটা রেখে দাও।” [সহিহ আবু দাউদ, হা/৩৫৩৫-শাইখ আলবানি]

قال النووي رحمه الله : وهذا صريح في إباحة حلق الرأس لا يحتمل تأويلاً . اهـ شرح مسلم ،
ইমাম নওবি রহ. বলন, “এ হাদিস থেকে মাথার চুল মুণ্ডনের বৈধতা এতটা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তা অন্য কোন ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। (শরহে সহিহ মুসলিম)

সুতরাং পরিশেষে বলব, কেউ যদি কোন বিদআতিদের সাদৃশ্য অবলম্বন, কাফের-মুশরিকদের অন্ধ অনুকরণ, রোগ-শোক থেকে মুক্তি লাভের আশা ইত্যাদি উদ্দেশ্য ছাড়া নিজস্ব অভিরুচি বা প্রয়োজন অনুযায়ী মাথার চুল মুণ্ডন করতে চায় তাহলে কোন আপত্তি নাই। তবে বিনা কারণে মাথার চুল মুণ্ডনের ব্যাপারে যেহেতু হালকা বিতর্ক রয়েছে সেহেতু বিরত থাকাই ভালো।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬◐◯◑▬▬▬▬
লেখক : আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।