Category: মতামত

  • সিলেট সীমান্ত, প্রাণহানি, অপরাধ আর রাজনৈতিক নীরবতার অস্বস্থিকর বাস্তবতা

    সিলেট সীমান্ত, প্রাণহানি, অপরাধ আর রাজনৈতিক নীরবতার অস্বস্থিকর বাস্তবতা

    হোসাইন আহমদ সুজাদ: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন ঘিরে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির বন্যা দেখা গেলেও একটি মৌলিক, জীবনঘনিষ্ঠ এবং দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত প্রশ্ন আবারও আড়ালে থেকে যাচ্ছে সিলেটের ৬৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত।

     

    সীমান্ত কেবল মানচিত্রের একটি দাগ নয়, এটি নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতি এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওত-প্রোতভাবে জড়িত একটি বাস্তবতা। পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছরে সিলেট সেক্টরের ৩০২ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় বিএসএফ ও খাসিয়াদের গুলিতে ২৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এই সংখ্যাটি নিছক একটি তথ্য নয়, প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারে শোক, একটি জনপদে আতঙ্ক এবং একটি রাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্নচিহ্ন।

     

    প্রশ্ন হচ্ছে এই মৃত্যুগুলো কি অনিবার্য ছিল? নাকি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, অবহেলা এবং কার্যকর সমন্বয়ের অভাবের ফল?

     

    বাসবতবতা হলো, সিলেট বিভাগের সীমাসবতবর্তী এলাকাগুলোতেই হত্যা, চুরি, মাদক পাচার, চোরাচালান, মানবপাচার, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বহু গুরুতর অপরাধের বিস্থার বেশি। সীমান্ত দুর্বল থাকলে তার প্রভাব কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না, পুরো বিভাগই ধীরে ধীরে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

     

    সীমান্ত কেন অপরাধের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠছে-

     

    সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সাধারণত রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি তুলনামূলক কম, নজরদারি দুর্বল এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ সীমিত। এই শূন্যতার সুযোগ নেয় চোরাচালান চক্র, মাদক কারবারি ও দালালচক্র। স্থানীয় কিছু মানুষ বাধ্য হয়ে বা প্রলোভনে জড়িয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকান্ডে। ফলে সীমান্ত কেবল নিরাপত্তা নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটেরও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

     

    একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমান্তে প্রাণহানির অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে চোরাচালান বা সন্দেহভাজন গতিবিধির প্রেক্ষাপটে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সীমান্তবাসী এমন ঝুঁকির পথে যায়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বিকল্প আয়ের অভাব এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা। অর্থাৎ, সীমান্ত সমস্যা কেবল আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি উন্নয়ন, জীবিকা ও রাষ্ট্রীয় মনোযোগের সমস্যা।

     

    দুই পাশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বৈষম্য-

     

    ভারতের সীমান্ত অংশে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া, নিয়মিত টহল, নজরদারি টাওয়ার, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের অংশে, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে, সমন্বিত ও আধুনিক নিরাপত্তা বলয়ের ঘাটতি দীর্ঘদিনের।

     

    এই বাস্তবতা সীমান্তকে অপরাধচক্রের জন্য সহজ রুটে পরিণত করেছে। এর খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ, আর প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ সীমান্তবাসী।

     

    রাজনৈতিক ইশতেহারে সীমান্ত নিরাপত্তা কেন নেই?

     

    দুঃখজনক হলেও সত্য, আসন্ন নির্বাচনে সিলেটের অধিকাংশ প্রার্থীর ইশতেহারে সীমান্ত নিরাপত্তা, সীমান্ত উন্নয়ন বা সীমাস্তবাসীর জীবন-জীবিকা নিয়ে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার অনুপস্থিত। যেন সীমান্ত একটি ‘প্রশাসনিক বিষয়’, রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো সীমান্ত ইস্যু রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে না এলে প্রশাসনিক সক্রিয়তাও টেকসই হয় না।

     

    সীমান্তের মানুষ যখন দেখে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটটি নির্বাচনী আলোচনায় স্থান পাচ্ছে না, তখন তাদের মধ্যে রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রতি এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়।

     

    কী প্রত্যাশা সীমান্তবাসীর?

     

    সীমান্তবাসীর প্রত্যাশা খুব জটিল নয়, বরং অত্যান্ত বাস্তব ভিত্তিক

     

    ১. সীমান্তে কার্যকর নিরাপত্তা জোরদার।

    ২. মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা।

    ৩. প্রাণহানি কমাতে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ।

    ৪. সীমান্ত এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন প্রকল্প।

     

    গীমান্ত নিরাপত্তা মানে শুধু অস্ত্রধারী টহল নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুত প্রশাসনিক সাড়া, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা এবং কার্যকর কূটনৈতিক সংলাপ।

     

    সীমান্ত নিরাপদ না হলে সিলেট নিরাপদ নয়।

     

    বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি সীমান্ত নিরাপদ না থাকলে সিলেটের কোনো উপজেলা, কোনো জনপদই দীঘর্-মেয়াদে নিরাপদ থাকতে পারে না। সীমান্তের দুর্বলতা ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিকে প্রভাবিত করে।

     

    নির্বাচন একটি নীরব প্রশ্নকে সামনে আনার সুযোগ-

     

    ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের দিন নয়; এটি একটি বড় সুযোগ সিলেটের সীমান্তকে জাতীয় ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে নিয়ে আসার। আশা করা যায়, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীরা সীমান্ত বাসীর এই ন্যায্য প্রশ্ন-গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং তাদের ইশতেহারে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকবে। কারণ সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

  • একটি ঘটনা, কিছু উপলব্ধি

    একটি ঘটনা, কিছু উপলব্ধি

    সকালে বাজারে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ নজরে পড়লো—৩ জন হেফজখানার শিক্ষার্থী একটি লিফলেট পেয়ে পা দিয়ে পাড়াচ্ছে। আবার আঞ্চলিক ভাষায় বলছে,

    “হে ওই… ওহাবি।”

    আমি থমকে গেলাম। ব্যাপারটা কী?

    একটু থেমে দেখি—ওটা জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত  নির্বাচনের একটি লিফলেট।

    লিফলেটের উপরে স্পষ্ট করে লেখা “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”,

    আর তাতে দাড়ি, টুপি ও পাঞ্জাবি পরিহিত একজন প্রার্থীর ছবি।

    আমি সত্যিই অবাক হলাম।

    যাদের হাতে লিফলেট, তাদের ন্যূনতম সাধারণ জ্ঞানটুকুও নেই—

    লিফলেটে বিসমিল্লাহ লেখা, দাড়ি-টুপি-পাঞ্জাবি পরা একজন মানুষকে যে তারা অবমাননা করা হচ্ছে!

    এই ঘটনাটা আমি আরেকটি কারণে শেয়ার করছি।

    এটা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল ২০১০–১১ সালের আগের সেই বাল্যকালে।

    সত্যি বলতে কী—আমিও তখন এমনই ছিলাম।

    আমার স্পষ্ট মনে আছে,

    আমি আলিয়া ঘরানার মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও নামাজ পড়তাম না।

    অনেকে বন্ধুরা বলত,

    “চলো, থানা মসজিদে নামাজ পড়ি।”

    আমি তখন বলতাম,

    “না, থানা মসজিদে নামাজ পড়লে আমার মাথা ব্যথা করে।”

    আজকে সেই আমি আর আগের আমি—

    আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

    যত বড় হচ্ছি, দ্বীনের ব্যাপারে তত উদার হচ্ছি,

    আর এটাই তো মধ্যম পন্থার আসল পরিচয়।

    মধ্যম পন্থা সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা:

    وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ

    “এভাবেই আমি তোমাদেরকে বানিয়েছি মধ্যপন্থী উম্মত, যাতে তোমরা মানুষের ওপর সাক্ষী হতে পার।” (সূরা বাকারা: ১৪৩)

    নবীজি ﷺ এর নির্দেশনা:

    سددوا وقاربوا… والقصد، القصد تبلغوا

    “তোমরা আমলে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, বাড়াবাড়ি করো না। পরিমিতি রক্ষা করলে অবশ্যই গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে।”

    (সহীহ বুখারী: ৬৪৬৩)

    আল্লাহ যেন আমাদের সমাজকে দ্বীনের সব ধরনের ফেতনা, গোঁড়ামি ও বিদ্বেষ থেকে হেফাজত করেন। আমিন।

  • মুসলমানদের ঐক্য ও ইতিহাস: অতীতের শিক্ষা আজকের জন্য

    মুসলমানদের ঐক্য ও ইতিহাস: অতীতের শিক্ষা আজকের জন্য

    ইতিহাসে মুসলিম জাতি এক সময় বিশ্বে অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি ছিল। তারা দীর্ঘকাল বিভিন্ন অঞ্চলে শাসন করেছে— যেমন; মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও পারস্য অঞ্চল, তুর্কি ও অটোমান সাম্রাজ্য, স্পেন (আন্দালুসিয়া), ভারতবর্ষ।

     

    এই সময়ের মধ্যে মুসলিম শাসনকারীরা শুধু ক্ষমতায় ছিল না, তারা শিক্ষা, বিজ্ঞান, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রেখেছিল।

    কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায়, যখন মুসলমানরা একমত ও ঐক্যবদ্ধ থাকে, তখন তাদের শক্তি অপ্রতিরোধ্য হয়। আর যখন বিভক্ত হয়, তখনই দুর্বলতা দেখা দেয়।

     

    ১৫০০ বছর আগের কোরআন আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়:

    “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো, কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে যেও না।”

     

    দুর্ভাগ্যবশত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজের মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও বিভাজনের কারণে ঐক্য হারিয়ে গেছে। পূর্বে আমাদের সোনালি ইতিহাস ছিল—মধ্যযুগে উন্নত সভ্যতা, স্থাপত্য ও বিজ্ঞান—কিন্তু আজ তা মূলত কাগজে কলমে সীমিত।

     

    উপরের ছবিতে দেখানো দৃশ্যটি তুর্কি সিরিজ ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবী’ থেকে নেওয়া, যেখানে এক খ্রিস্টান কমান্ডার সালাহউদ্দিন আইয়ুবী রহঃ কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন:

    “তোমরা মুসলমানরা কখনোই ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না।”

     

    এই দৃশ্য শুধু ইতিহাসের পুনঃচিত্র নয়; এটি আমাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ঐক্যবদ্ধ না হলে শক্তি ক্ষয় হয়, এবং বিভাজন আমাদের বিপদের মুখে ফেলে। ইতিহাসের এই পাঠ আজও প্রাসঙ্গিক।

     

    আজ আমাদের দরকার ঐক্য ও সমন্বয়। সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমরা যদি একমত হয়ে কাজ করি, তাহলে আমরা আবারও সেই শক্তি অর্জন করতে পারি যা আমাদের পূর্বপুরুষদের ছিল।

     

    একতার সঙ্গে কোরআনের নির্দেশ ও আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ মেলালে, মুসলিম সমাজ একবার পুনরায় সমৃদ্ধি ও শক্তির পথে এগোতে পারে।

     

    মুসলিম জাতির শক্তি শুধু অস্ত্র বা রাজনীতি নয়, বরং ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও শিক্ষায় নিহিত। অতীতের ইতিহাস আমাদের শেখায়, বিভাজন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, কিন্তু ঐক্য আমাদেরকে পুনর্জীবিত করতে পারে। আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব এই শিক্ষা মনে রেখে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই সোনালি ইতিহাসকে জীবন্ত করা।

  • চির অমর আল্লামা ফুলতলী

    চির অমর আল্লামা ফুলতলী

    মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক:

    ভারতীয় উপমহাদেশের খ্যাতিমান প্রাণপুরুষ অগণীত জনতার হৃদয় রাজ্যের যিনি মুকুটহীন সম্রাট শামসুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ:) এক জীবন্ত ইতিহাস, গেীরবের কিংবদন্তি। সত্য-ন্যায় এবং আহলে সুন্নাতওয়াল জামাতের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন, পাশাপাশি জ্ঞানের আলো বিতরণে নিরলস চেষ্টা করেছেন। ইসলাহে নফসের জন্য তিনি যেমন আজীবন চেষ্টা সাধনা করেছেন তেমনি গুরুত্বের সাথে ইসলাহে কওম ও হুকুমতের জন্যও চালিয়েছেন বিরামহীন জেদ্দ-জেহাদ।

    আল্লামা ফুলতলী (রহ:) আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তায় ও বিশ্বাসে অনিন্দ্য সুন্দর উপাসনা আর বলিষ্ঠ ও প্রখর ব্যক্তিত্বের গুণাবলী সবার মাঝে ছড়িয়ে আছে। তাঁর জীবনের বিভিন্ন গুণাবলি আমাদেরকে সঠিক পথ চলতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তিনি উপযুক্ত কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছেন, সংগঠন কায়িম করেছেন, দুর্বার আন্দোলন সৃষ্টি করেছেন, বিভিন্ন দেশে ও মহাদেশে তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। সর্বত্র সেসব সংগঠনের শতশত শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী চলছে সত্যিকার দ্বীন কায়িমের সুমহান খিদমত। তিনি ছিলেন একজন যুগ শ্রেষ্ঠ খ্যাতিমান আলেম। তাঁর আপাদমস্তক ছিল রাসুল (সা:)-এর আদর্শে উদ্ভাসিত। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী প্রত্যেক নির্যাতিত, নিপীড়িত, অবহেলিত এবং মজলুম অনাথ মানুষের পক্ষে সু-উচ্চ কন্ঠস্বর। তিনি ছিলেন জালিম ও রাসুল (সা:)-এর শক্রদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিশেষ করে তাগুতের বিরুদ্ধে তাঁর সময়োপযোগী এবং সাহসী কন্ঠ ছিল ধারালো তরবারির চেয়েও কঠোর। রাসুল (সা:)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত এ মহান ব্যক্তির মাঝে ছিল প্রেম, প্রীতি, স্নেহের ও ভালোবাসার মধুর সুর, অনাচার নির্যাতনের এবং সকল বাতিলের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন বিদ্রোহের প্রতীক। তিনি কখনো ছিলেন কোমল আবার কখনো কঠোর এক প্রাচীর।

    সত্যিই নানা বিস্ময়কর ও বৈচিত্রে ভরপুর আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এর জীবনালেখ্য। আমরা যেমন তাঁকে দেখতে পাই বিজন পার্বত্য-অরণ্যে গভীর ধ্যানমগ্ন সাধক রূপে, তেমনি দেখতে পাই আল্লাহ তায়ালার দ্বীন কায়েম এবং রাসুল (সা:)-এর আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও সংগ্রামের ময়দানে অকুতোভয় মুজাহিদ, অগ্রপথিক বীর সিপাহসালার রূপে। ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এর চরিত্র আচার-আচরণ ও ব্যবহার ছিল নম্রতা ও ভদ্রতায় পরিপূর্ণ। জীবনের ঊষালগ্ন থেকে ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম জাতির ক্রান্তিকালের উত্তরণে চিন্তা মাথায় নিয়ে যারা সামনে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে দীপ্ত কঠিন শপথে আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এর অভিযাত্রা অন্যতম। তিনি কোরআন ও হাদিসকে সামনে রেখে বাতিলের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠে বীরদর্পে সামনে এগিয়ে যান। কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস’সহ ধর্মীয় প্রত্যেক কিতাবের মর্মবাণী উপলব্ধিকরে সফলতা ও কৃতিত্বের সাথে উপস্থাপন করে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষাবিদেও মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ঈমান আক্বিদা রক্ষার আন্দোলনে তাকে পাওয়া যেত অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো।

    বাংলার আধ্যাত্নিক রাজধানী নামে পরিচিত সিলেটের মুকুটহীন সম্রাট শাহজালাল ইয়ামনি (রহ:)-এর ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম শাহ কামালের নয়নের মধ্যমণি আল্লামা ফুলতলী (রহ:) ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল, অবিচল, নিরহংকার, খোদাভীরু, শান্তিপ্রিয় রাসুল প্রেমিক। সামাজি, রাজনৈতি ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম, হিন্দু, বৌব্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যকার শান্তি সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। ইসলামি চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে তিনি সু-লেখক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, মিষ্টভাষি সুবক্তা, আহলে সুন্নাত ওয়লা জামাতের বীর সিপাসালার আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এর অন্যতম চিন্তার চেতনার হাতিয়ার আনোয়ারুস সালিকিন অথবা নালায়ে কলন্দর নামে কাব্যগ্রন্থ দু‘টি বরেণ্য কবিদের চেয়ে কম নয়? এছাড়া পবিত্র আল-কোরআন সহিহ শুদ্ধভাবে তিলাওয়াতের জন্য তাঁর অন্যতম একটি রচনা হলো “আল-কাউলুছ ছাদীদ”।

    সকল অপশক্তির হাত থেকে সাধারণ মুসলমানদের ঈমান-আমল রক্ষা করার জন্য তিনি বৃদ্ধ বয়সে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণে আল্লামা ফুলতলী (রহ:) কে ভাবিয়ে তুলেছিল। তাই তিনি প্রত্যেকের কল্যাণের জন্য নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত হাজারও এতিম-অনাথদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল লতিফিয়া এতিমখানা, বাদে দেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসা, সোহানীঘাট কামিল মাদরাসা, বৃদ্ধানিবাস প্রকল্প, ফ্রি ডিসপেনসারী, লতিফিয়া শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট, শিক্ষক সংগঠন জমিয়তুল মোদারিছীন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পবিত্র আল-কোরআন বিশুদ্ধভাবে পড়ার সাড়া জাগানো “দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট” তাঁর শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যিনি তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময় ব্যয় করে গেছেন পবিত্র কোরআনের খেদমতে, যিনি তাঁর সম্পদের এক বিশাল অংশ (৩৩ একর জমি) দান করে গেছেন দারুল কিরাতের নামে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স, স্কটল্যান্ড এবং পার্শ্ববর্তী ভারতের মতো বিভিন্ন বিধর্মী ও খ্রিষ্টানপ্রধান দেশগুলোর মধ্যেও গড়ে তুলেছেন, অসংখ্য-অগণিত মসজিদ, মাদরাসা, পৌঁছে দিয়েছেন ইসলামের সুমহান বাণী এবং সহি আকিদা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান যুগ যুগ ধরে মুসলিম হৃদয়ে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

    আল্লামা ফুলতলী (রহ:) এখন আর কোনো সাধারণ নাম নয়! একটি সংকল্পের, একটি আদর্শের, একটি সংগ্রামের, একটি লক্ষের, একটি সোনালী ইতিহাসের নাম। মুসলিম ইতিহাসে আল্লামা ফুলতলী (রহ:) নামটি থাকবে চির-অমর, অক্ষত-অম্লান। তিনি তাঁর অবস্থানে এক ও অদ্বিতীয়, অতুলনীয়, অনন্য, অসাধারণ। আমার স্বপ্নের কল্পনার ও শ্রদ্ধায়, আমার আস্থা ও ভালোবাসার প্রতিক আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এ পৃথিবীতে একবারই এসেছিলেন, আর দ্বিতীয় কোন আল্লামা ফুলতলী (রহ:)-এই জমিনে ফিরে আসবেন না। তবে আল্লামা ফুলতলী (রহ:) আজ দুনিয়ায় নেই বলে, তার সুমহান আদর্শ, অপরিণামদর্শী ত্যাগ-তিতিক্ষার, কোনকিছুই তিল পরিমাণও ক্ষয় হয়নি। বরং তাঁর ইন্তেকালের পর থেকে দেখা যাচ্ছে যে, জীবিত আল্লামা ফুলতলী (রহ:) চেয়ে ওফাত আল্লামা ফুলতলী (রহ:) বেশী ক্ষমতাসম্পন্ন!

  • এই দেশে বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় মিরাকল!

    এই দেশে বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় মিরাকল!

    এই দেশে কেউ নিরাপদ না।

    এই দেশে আপনি বেঁচে আছেন—এটাই সবচেয়ে বড় মিরাকল।
    কারণ, এই দেশের নাগরিকদের কোনো মূল্য নেই।
    সবচেয়ে সস্তা জিনিসটা এখানে মানুষের জীবন।

    ভাবুন—
    আপনি ঢাকার রাস্তায় বের হলেন। হঠাৎ করে মাথার ওপর থেকে মেট্রোরেলের একটি বিয়ারিং প্যাড (বিয়ারিং স্প্রিং) খুলে পড়ল। মুহূর্তেই আপনি নি-হত।
    কার দায়?
    কেউ জানে না। কেউ নেয় না।

    আপনি রাস্তায় চলছেন, হঠাৎ কোনো আন্দোলন।
    আপনাকে শিবির ট্যাগ দেওয়া হলো।
    হিন্দু ধর্মের অনুসারী বলেও আপনাকে রেহাই দেওয়া হবে না।
    বিশ্বজিৎ-এর মতো প্রকাশ্য রাস্তায় কু-পিয়ে হ-ত্যা করা হবে—আর চারপাশ দাঁড়িয়ে শুধু ভিডিও করবে।

    আপনি সীমান্ত এলাকায় গেলেন
    কোনো প্রশ্ন ছাড়াই গু-লি।
    কাঁটাতারের ফাঁকে ফিলানীর মতো ঝুলে থাকবে আপনার লা-শ।

    রাষ্ট্র চুপ, প্রতিবেশী চুপ—মানুষের জীবন এখানে কেবল একটি সংখ্যা।

    আপনি রাস্তায় বের হলেন—
    শ-হিদ হাদি ভাইয়ের মতো প্রকাশ্যে গু-লি করে মা-রা হবে আপনাকে। তাও রাষ্ট্র চুপ থাকবে।

    আপনি এবার রাস্তা পারাপার করলেন—
    একটি বেপরোয়া ট্রাক চাপা দিয়ে চলে যাবে আপনার বুকের ওপর দিয়ে। এই দেশটা এমনই। তাও সড়কের নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা দিবে না।

    এই বাস্তবতার মাঝেই, আজ হবিগঞ্জে আবার দুইটি জীবন নিভে গেল।
    একজন শিশু—রাজি ইবনে মাহবুব।
    একজন বাবার একমাত্র সন্তান।
    একজন মাদ্রাসাছাত্র, যার চোখে ছিল কুরআনের স্বপ্ন।
    খোয়াই নদীর পাড়ে মিলিয়ে গেল সেই স্বপ্ন।
    কেন, কীভাবে—এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।

    আরেকজন—শহরের প্রিয় ইমাম,
    হাফেজ সেলিম আহমেদ।
    যিনি প্রতিদিন মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতেন,
    আজ তিনি নিজেই সড়ক দুর্ঘট-নার শিকার।
    একটি রাস্তা কেড়ে নিল একটি মসজিদের কণ্ঠস্বর।

    এই মৃত্যু শুধু রাজির পরিবারের না,
    শুধু হাফেজ সেলিমের পরিবারের না—
    এগুলো আমাদের সমাজের আয়না।

    এই দেশে আপনি নিরাপদ না—
    শিশু হলে না, ইমাম হলে না, সাধারণ মানুষ হলে তো নয়ই।
    তবু আমরা চুপ। রাষ্ট্রও চুপ!

    কারণ আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
    কিন্তু মনে রাখবেন—
    আজ রাজি, আজ হাফেজ সেলিম।
    আগামীকাল নামটা আপনারও হতে পারে।
    এই দেশে বেঁচে থাকা কোনো অধিকার না—
    এটা এখন শুধুই ভাগ্যের ব্যাপার।

  • সড়ক পথে ঝরছে তাজা প্রাণ

    সড়ক পথে ঝরছে তাজা প্রাণ

    মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক:

    সড়কে প্রতিদিনই ঝরছে তরতাজা প্রাণ। খালি হচ্ছে অনেক মায়ের বুক। হাজার হাজার পরিবার পথে বসছে। আর প্রিয়জন হারানোর কষ্টের কোনো বর্ণনা হয় না। যে হারায় কেবল সেই বোঝে। কোনোক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু রোধকরা যাচ্ছে না। অদক্ষ চালক, মাদকাসক্ত চালকদের যানবাহন চালানো, লক্কড় ঝক্কড় যানবাহন, ঢিলেঢালা ট্রুাফিক ব্যবস্থাপনা, আগে যাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা, নিয়ম না মেনে ওভারটেকিং, যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, পেছনের বাসকে সামনে আসতে না দেওয়ার প্রতিযোগিতা, সড়কে খানাখন্দ, সড়কের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় গতিসীমা না মানার কারণে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। আবার অনেকে চিরতরে পঙ্গু হচ্ছেন।

    ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। তাদের দেখার কেউ নাই। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সিলেটে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মেয়ে ও এক পর্যটকসহ ৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ৯ জন। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল হচ্ছে লম্বা। কোনোক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু রোধকরা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সড়ক নিত্যদিন জীবন কেড়ে নিচ্ছে। নেই কোন প্রতিকার। নিয়ন্ত্রণও করা যাচ্ছে না। এর থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?

    হাইওয়েতে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু হাইওয়ে পুলিশকে দায়ী করলে ঠিক হবে না। জনবল ও যানবাহন সংকটের কারণে বিপাকে রয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। সারাদেশে ৬৪ জেলার মধ্যে ৪২টি হাইওয়ে পুলিশের অধীনে। ২০০৫ সালে হাইওয়ে পুলিশ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। শুরুতেই ছিল ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারের মতো হাইওয়ে পুলিশের অবস্থা। বর্তমান সরকারের আমলে যানবাহন ও জনবল বৃদ্ধি করা হলেও চাহিদার তুলনায় তা অতি নগণ্য। আবার এক শ্রেণীর হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রাস্তায় থাকেন না তারা। নছিমন-করিমনসহ অবৈধ যানবাহনগুলো টাকার বিনিময়ে হাইওয়েতে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়। আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। এদিকে অনেক গাড়ির মালিক প্রভাবশালী। কেউ কেউ আছেন শ্রমিক সংগঠনের নেতা। এসব গাড়ির ড্রাইভাররা বেশি বেপরোয়া আচরণ করে থাকে। কিছু ড্রাইভারের ভাবখানা এমন যে, সড়কে মানুষ মারার লাইসেন্স তাদের দেওয়া হয়েছে।

    পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলেন, চালকদের আইন না মানার অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের মানসিকতা। নগর-মহানগরীর রাস্তা এবং হাইওয়েগুলোয় ট্রাফিক সিগন্যালের বালাই নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত ট্রাফিক সার্জন বা পুলিশ গাড়ির সামনে গিয়ে না দাঁড়ান চালকরা তাদের গাড়ি থামানোর কোন প্রয়োজনই মনে করে না। ট্রাফিক সিগন্যাল চালু না থাকায় চালকদের এই মানসিকতা তৈরি হয়েছে। অথচ ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কোন চালক ট্রাফিক আইন ভঙ্গের চিন্তা করে না। এ কারণেই চালকদের আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। আইন অমান্যকারীকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবেই চালকদের শৃঙ্খলায় আনা সম্ভব হবে।

  • নিঃসঙ্গতার দেশ দক্ষিণ কোরিয়া

    নিঃসঙ্গতার দেশ দক্ষিণ কোরিয়া

    শাহ হারুন রশিদ: আমার চাকুরী জীবনে কোরিয়ায় অনেক বছর অতিবাহিত করেছি ,কোরিয়ান সহকর্মী বন্ধুদের কাছ থেকে যা জেনেছি তাই আপনাদের জন্য লিখলাম।

     

    জ্ঞান বিজ্ঞানে পৃথিবীতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে দক্ষিণ কোরিয়া কিনতু মানুষের মনে শান্তি নাই অর্থের পিছনে ছুটতে ছুটতে তাদের জীবনে দেখা দেয় অমানিশার অন্ধকার।

    দক্ষিণ কোরিয়ায় নিঃসঙ্গতা এখন এক অব্যক্ত সংকট। প্রতি বছর হাজারো মানুষ সমাজের বাইরের জীবন বেছে নিয়ে একাকী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব মানুষ অবসাদে ডুবে গিয়ে সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং পরিবার ও বন্ধুদের ছেড়ে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেন।

     

    সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, কখনো কখনো তাদের মৃত্যুর বিষয়টি জানতেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কোরিয়ায় এ ধরনের একাকী মৃত্যু ‘গোডোকসা’ নামে পরিচিত, যা সমাজের এক গভীর ক্ষত হিসেবে বিরাজ করছে।

     

    উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে নিম্ন জন্মহারের দেশগুলোর মধ্যে একটি দক্ষিণ কোরিয়া। জন্মহার কমে যাওয়ার সাথে সাথে সমাজে একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার হার বেড়ে চলেছে।

     

    এ বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সম্প্রতি সিউল শহরের কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তারা এমন একটি শহর নির্মাণের লক্ষ্য নিয়েছে, যেখানে কেউ একা থাকবেন না। এই মানবিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার ৪৫১.৩ বিলিয়ন ওন (প্রায় ৩২৭ মিলিয়ন ডলার) ব্যয় করবে।

     

    এই প্রকল্পে থাকবে ২৪/৭ একাকিত্ব পরামর্শদাতার সেবা, একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেখানে যে কেউ সরাসরি পরামর্শ নিতে পারবেন, এবং প্রয়োজনে ব্যক্তিগত পরিদর্শনের সুযোগ। সিউলের মেয়র ওহ সেহুন বলেন, এটি শুধু ব্যক্তিগত সংকট নয়, এটি আমাদের সমাজের ব্যর্থতা। আমাদের সবার দায়বদ্ধতা রয়েছে একে মোকাবিলা করার জন্য।

     

    কেবল শহর নয়, কোরিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারও একাকী তরুণদের পুনর্বাসনে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। সমাজবিচ্ছিন্ন যুব সম্প্রদায়কে মাসিক ৬ লাখ ৫০ হাজার ওন (প্রায় ৪৭৫ ডলার) আর্থিক সহায়তা দিয়ে তাদের কর্ম ও সামাজিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করা হবে।

     

    বিশেষজ্ঞদের মতে, একাকিত্বের এ সংকটের পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিযোগিতামূলক কর্মসংস্কৃতি, অহংকেন্দ্রিক জীবনধারা, সামাজিক মিডিয়ার তুলনা-প্রবণতা, এবং একক পরিবারে বসবাসের উচ্চ হার এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া নিঃসঙ্গতার এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

     

    এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে হয়তো অনেক মানুষ আর একা মৃত্যুর পথে অগ্রসর হবেন না। তবে সরকার ও সমাজের সব স্তরের সমন্বিত প্রয়াসই দক্ষিণ কোরিয়ায় একাকিত্বের বিরুদ্ধে মানবিক জয় আনতে পারে।